মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট, ভিসা-বাণিজ্য এবং অসাধু জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সিন্ডিকেটের কারণে বিদেশগামী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে। কাগজে-কলমে বিদেশ পাঠানোর খরচ কম দেখানো হলেও বাস্তবে তা কয়েকগুণ বেশি। অথচ এই ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
দশ বছর আগে সরকার বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সির সার্ভিস চার্জসহ অন্যান্য খরচ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের তদারকির অভাব এবং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এই নির্ধারিত মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় ভিসাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ৫-৬ গুণ পর্যন্ত বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়া, বাহরাইন, আরব আমিরাতসহ ১৪টি দেশ এবং ২০১৬ সালে সৌদি আরবের জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় অভিবাসন ব্যয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেই তালিকায় সৌদি আরবের জন্য এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা, মালয়েশিয়ার জন্য এক লাখ ৪০ হাজার, কাতারের জন্য এক লাখ টাকা এবং ওমানের জন্য এক লাখ টাকাসহ বিভিন্ন দেশ অনুযায়ী ব্যয় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া কাতারে কর্মী পাঠাতে এক লাখ টাকা, জর্ডানে এক লাখ ২৭৮০ টাকা, মিসরে এক লাখ ২০ হাজার, রাশিয়ায় এক লাখ ৬৬ হাজার, মালদ্বীপে এক লাখ ১৫ হাজার, ব্রুনাইয়ে এক লাখ ২০ হাজার এবং লেবাননে এক লাখ ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি ব্যয় নির্ধারণের পরও তা বাস্তবায়ন না হওয়ার প্রধান কারণ হলো ভিসা-বাণিজ্য ও অগ্রহণযোগ্য ব্যয় নির্ধারণ। এছাড়া দেশি-বিদেশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বড় বাধা। প্রবাসীরা বলছেন, এই অতিরিক্ত খরচের কারণে তাদের জীবনমানের উন্নতি তো দূরের কথা, ঋণ শোধ করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। সুনামগঞ্জের রিসান আহমদ কাতারে নির্মাণ ভিসায় গিয়ে সাড়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করেছেন, যা মেটাতে তাকে চাষের জমি বিক্রি করতে হয়েছে। অথচ দেড় বছর পার হয়ে গেলেও তিনি তার ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ টাকাও তুলতে পারেননি। সৌদিপ্রবাসী রবিউল আলম বলেন, ২০২০ সালে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে প্রবাসে আসি। আসার পর কাজ ছিল না। ফলে ছয় মাস বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারিনি। বছর শেষে ইকামা খরচ তিন লাখ টাকা। বাড়িতে টাকা পাঠাব, নাকি ঋণ শোধ করব? নাকি ইকামা করব? কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে এখন আমি অবৈধ অবস্থায় আছি, গোপনে কাজ করে যাচ্ছি। সৌদিতে আমার মতো এমন অবৈধ কর্মী আছে কয়েক লাখ। আমরা দেশে গেলে একেবারে চলে যেতে হবে। বৈধ হতে হলে সাত-আট লাখ টাকা লাগবে। সেই আয় তো নেই। কেউ পাঁচ বছর, কেউ ১০ বছর ধরে এখানে মাটি কামড়ে পড়ে আছে। আমি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছি, কিন্তু জীবন এখানে শেষ করে দিচ্ছি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২২ সালে গড় ব্যয় ছিল তিন লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা ২০২৪ সালে চার লাখ ৬৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। গবেষণায় দেখা যায়, একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের অভিবাসন ব্যয় তুলতে গড়ে ১০ দশমিক ২ মাস কাজ করতে হয়, যেখানে ফিলিপাইনের পুরুষ শ্রমিকের লাগে মাত্র ১ দশমিক ১ মাস।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, ১০ বছর আগের নির্ধারিত ব্যয় বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, শ্রমবাজার সীমিত হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, প্রতি বছর মন্ত্রণালয় থেকে তদারকি না করলে এই সিদ্ধান্ত কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তিনি রসিদ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।