আল্লাহতায়ালার অশেষ নেয়ামতের একটি বড় অংশ হলো মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নবী ও রাসুলদের প্রেরণ। দুনিয়া এবং পরকালীন সফলতার জন্য তাঁদের প্রদর্শিত পথই একমাত্র অবলম্বন। মানুষের আত্মিক ও দেহগত প্রয়োজনে রাসুলদের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ ভালো ও মন্দের পার্থক্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায় কেবল তাঁদের মাধ্যমেই জানা সম্ভব। পৃথিবী যতদিন নবুয়তের প্রভাব ধারণ করবে, ততদিনই তা টিকে থাকবে। আল্লাহতায়ালা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর কাছেও স্পষ্ট নিদর্শনসহ রাসুল প্রেরণ করেছেন, যার উল্লেখ রয়েছে সুরা ইবরাহিমের ৯ নম্বর আয়াতে।
বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর নবুয়তের প্রমাণ ও মুজিজাসমূহ যেকোনো নবীর চেয়ে অধিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। সুরা হামিম সেজদার ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি বিশ্বজগতে ও মানুষের নিজেদের মধ্যে তাঁর নিদর্শনাবলি ব্যক্ত করবেন, যাতে সত্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে কোরআন নাজিল হওয়ার পর মুশরিকরা তা গ্রহণ না করে বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করেছিল। তারা প্রশ্ন তুলেছিল, কেন এই কোরআন মক্কা বা তায়েফের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ওপর নাজিল হলো না (সুরা জুখরুফ : ৩১)।
মুশরিকরা যখন কোরআনের মতো রচনা আনার চ্যালেঞ্জে ব্যর্থ হলো, তখন তারা মহানবী (সা.)-কে কোরআন বদলানোর কিংবা অন্য কিছু আনার দাবি জানায় (সুরা ইউনুস : ১৫)। তারা কোরআন খণ্ড খণ্ডভাবে নাজিল হওয়ার পরিবর্তে একবারে নাজিল হওয়ারও দাবি করেছিল (সুরা ফুরকান : ৩২)। তাদের অহংকার ও জেদ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, তারা নবীজিকে আকাশে মই বেয়ে উঠতে এবং আকাশ থেকে প্রত্যেকের নামে আলাদা আলাদা কিতাব নিয়ে আসার দাবি জানায় (সুরা মুদ্দাসসির : ৫২)।
মুশরিকদের একগুঁয়েমি এখানেই থেমে থাকেনি। তারা ফেরেশতাদের অবতরণ এবং আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার দাবিও করেছিল (সুরা বাকারা : ১১৮)। এমনকি তারা নিজেদের মর্যাদা জাহির করতে নবীদের মতো নিদর্শন পাওয়ার দাবি জানায়, যার জবাবে আল্লাহ বলেছেন যে, রিসালাতের দায়িত্ব কার ওপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভালো জানেন (সুরা আনআম : ১২৪)।
ধর্মীয় যুক্তিতে হেরে যাওয়ার পর তারা নবীজিকে অপমান করতে দুনিয়াবি বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করে। তারা মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় বসে দাবি করে যে, যদি তিনি সত্য নবী হন তবে তাঁর খেজুর ও আঙুরের বাগান, ঝরনা, নদী এবং স্বর্ণের ঘর থাকা উচিত (সুরা বনি ইসরায়েল : ৯৩)। তাদের এসব দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা উল্টো নবীজিকে আজাব নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। তারা বলত, আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করা হোক অথবা মর্মন্তুদ শাস্তি দেওয়া হোক (সুরা আনফাল : ৩২)।
যারা নবুয়তের সত্যতা জানতে চায়, তাদের জন্য মহাগ্রন্থ কোরআনই সবচেয়ে বড় দলিল। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, পূর্ববর্তী নবীদের মতো তাঁকেও আল্লাহ অহি বা প্রত্যাদেশ দিয়েছেন, যার মাধ্যমে মানুষ ঈমান আনে। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে, যখন কোনো নবীর হাতে সত্যতার প্রমাণস্বরূপ মুজিজা প্রকাশিত হয়, তখনই হুজ্জত কায়েম হয়ে যায়। এরপর বারবার নিদর্শন চাওয়া জরুরি নয়, কারণ জেদি লোকদের দাবির কোনো শেষ নেই। ইসলামের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর একত্ববাদ এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণই একজন মানুষের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করে।