জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যা এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সারা দেশে দায়ের হওয়া ৮৮ শতাংশ মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও অধিকাংশ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়েনি। পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের পর সারা দেশে মোট ৮০১টি হত্যা মামলা এবং ১ হাজার ৬৪টি হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য মামলা দায়ের করা হয়, যার মোট আসামি সংখ্যা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩১ জন। এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫৯টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে, যা মোট মামলার ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
তদন্তকারী সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, জুলাই আন্দোলনের পর ঢাকার আদালত ও বিভিন্ন থানায় ৭৮৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল। এর মধ্যে গত ২১শে জুলাই পর্যন্ত পুলিশ ৩৭টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে, যার মধ্যে ২৮টি হত্যা মামলা। বর্তমানে এই মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে এবং মহানগর আদালতে দু’টি মামলার চার্জ গঠন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জুলাই আন্দোলনের ৮২টি এবং আদালতের নির্দেশে অতিরিক্ত ১৯৭টি সিআর মামলা তদন্ত করছে। ২১শে জুলাই পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ২০৮টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে, যার মধ্যে ৪৯টি হত্যা মামলা এবং ১৫৯টি অন্যান্য অভিযোগে দায়েরকৃত। বর্তমানে পিবিআইয়ের অধীনে ৭১টি মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
তদন্তে ধীরগতির কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বা ভিডিও না পাওয়া, সাক্ষীর অভাব এবং বিপুল সংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামির কারণে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ঘটনার জন্য একাধিক থানায় মামলা হয়েছে এবং আসামি তালিকায় প্রবাসীদের পাশাপাশি জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বৈজ্ঞানিক প্রমাণ যেমন ডিএনএ বিশ্লেষণ, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরাও ভয়ের কারণে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী নন।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের মৃত্যুর ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। ১৯শে জুলাই বসিলা ব্রিজের ঢালে গুলিতে নিহত হওয়ার পর তার মা অজ্ঞাতনামা শতাধিক আসামি করে মামলা করেন। পিবিআই বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করলেও কোনো সাক্ষী বা ভিডিও ফুটেজ না পাওয়ায় আসামি শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। একই ধরনের জটিলতায় আটকে আছে বসিলা উত্তরপাড়ার মো. মনসুরের হত্যা মামলাটিও। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি মামলার নিরপেক্ষতা ও প্রমাণের মান নিশ্চিত করতে তাড়াহুড়া না করে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরেও জুলাই আন্দোলনের নামে মামলা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা তদন্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তুলেছে।