বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছে যে, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর সম্মতিসূচক স্বাক্ষর বা একটি লিখিত সম্মতি বিবৃতি দিতে হয়, যা মির্জা ফখরুল গত শনিবার সম্পন্ন করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় সংসদ সদস্যের প্রস্তাব ও সমর্থনের পাশাপাশি প্রার্থীর সই করা ঘোষণা বা বিবৃতি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছে। রোববার মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১-দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপি অনীহা দেখানোয় তারা আলাদাভাবে প্রার্থী দিয়েছে। অলি আহমদ নিজেও এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং প্রার্থী মনোনীত হওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানান, এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রার্থী হওয়া অনেকটাই নিশ্চিত, যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো বাকি। গত ২ আগস্ট বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলীয় প্রধান তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোট গ্রহণ হবে এবং ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দেওয়া যাবে।
বিএনপি ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী সিইসির দপ্তর থেকে এগুলো সংগ্রহ করেন। ইসি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে একই ব্যক্তির নামে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যায়। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সময়ও দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর পদটি শূন্য হয় এবং বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়।
মির্জা ফখরুল ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন এবং ২০১৬ সালে জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নিযুক্ত হন। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে তিনি দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের নির্বাসনের পুরো সময় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছয়বার কারাগারে গিয়েছেন। এখন তিনি রাষ্ট্রপতি হলে মহাসচিব পদে সালাহউদ্দিন আহমদ বা রুহুল কবির রিজভীর নাম আলোচনায় আসছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ১৯৯১ সালে বিএনপি ১৪০টি এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেয়েছিল। সেবার জামায়াতের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তাদের প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বর্তমানে সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার দিনই ৩৪৯ জন ভোটারের তালিকা প্রকাশ করেছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর সদস্যপদ শূন্য হয়ে যায়। তবুও বিরোধী দল প্রার্থী দেওয়ায় ইসি এখন ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ব্যালট পেপার ছাপানোর কাজ করছে।