চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এমন বিপর্যয়কর ফলাফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে এবং তারা শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরকারি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছেন।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখায় অংশ নেওয়া পাঁচ শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। বিদ্যালয়টিতে আটজন শিক্ষক থাকলেও মাত্র পাঁচজন পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ায় পাঠদানের মান ও শ্রেণি কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওমর ফারুক ভূঁইয়া জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে কর্তৃপক্ষকে শোকজ করা হবে।
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার চকনোদবাটি ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার ১৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে। একই জেলার বদলগাছী উপজেলায় জোলাপাড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার তিনজন এবং গোবরচাপাহাট আখতার হামিদ সিদ্দিকী দাখিল মাদরাসার একজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলম জানান, প্রতিষ্ঠান দুটি এমপিওভুক্ত নয়।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৮টি বিদ্যালয় থেকে একজনও পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরের পীরগঞ্জের কুমারপুর ও ঘাসিপুর হাইস্কুল, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের কাজীপাড়া ও পলাশবাড়ীর মনোহরপুর গার্লস স্কুল, নীলফামারীর ডোমার আমবাড়ী বহুমুখী গার্লস স্কুল, কুড়িগ্রামের রাজারহাটের তালতলা হাইস্কুল, মাধবপুর গার্লস স্কুল ও তাজবাড়িগঞ্জ হাই স্কুল। এছাড়াও পঞ্চগড়ের বোদার বলরামহাট গার্লস স্কুল ও সরদারপাড়া গার্লস হাই স্কুল, কুড়িগ্রামের পূর্ব কোমরপুর হাইস্কুল, ব্রাহ্মণপাড়া হাইস্কুল, পাথরডুবি আদর্শ হাই স্কুল এবং লালমনিরহাটের কালিগঞ্জের এ,এন রথবাড়ী গার্লস হাই স্কুল থেকে কেউ পাস করেনি। নবাবগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ের ২০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল, কিন্তু একজনও পাস করতে পারেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান খুবই খারাপ এবং শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে আসেন না বা পাঠদান করান না।
ঠাকুরগাঁও সদর ও হরিপুর উপজেলার পাঁচটি বিদ্যালয় থেকে মোট ২৪ জন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। বিদ্যালয়গুলো হলো আকচা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়, অনভারডিঘি উচ্চবিদ্যালয়, মাধবপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, তাওরিগাঁ উচ্চবিদ্যালয় এবং রামপুর ভাতুরিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। পাবনার ভাঙ্গুড়ায় মাগুড়া দাখিল মাদরাসা থেকে ১৯ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ২০০১ সালে এমপিওভুক্ত এই মাদরাসাটির শিক্ষার মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমছে। এছাড়া একই উপজেলার লতিফা-আয়শা দাখিল মাদরাসা থেকে ২০ জন অংশ নিয়ে মাত্র একজন কৃতকার্য হয়েছে।
টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ৫৯টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ৩,৩৯১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে ১,৮৫০ জন পাস করেছে এবং ১,৩৪১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাসের হার ৬১.৬৫ ভাগ, মাদরাসার ৩৯.১৭ ভাগ এবং ভোকেশনালের ৪৫.৭০ ভাগ। এ বছর উপজেলায় এ প্লাস পেয়েছে ৬৩ জন। তবে উপজেলার ভারড়া ইউনিয়নের আগদিঘুলিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার একজন এবং সলিমাবাদ ইউনিয়নের আনোয়ার খান মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নাদির আহাম্মদ জানান, পাসের হার শূন্য হওয়া প্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের রিপোর্ট ইতিপূর্বে দেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এগুলো হলো আশাশুনি গোদাড়া নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, সাতক্ষীরা নৈশ বিদ্যালয়, দেবহাটা উপজেলার বাবুরাবাদ ঢেবুখালী বিদ্যালয় এবং শ্যামনগর উপজেলার সাহেবখালী সিদ্দিকগাজী বিদ্যালয়। আশাশুনি গোদাড়া নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের চারজন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে। দেবহাটার বাবুরাবাদ ঢেবুখালী বিদ্যালয়ের চিত্র আরো নাজুক; ২০০১ সাল থেকে শিক্ষকরা বেতন-ভাতা না পাওয়ায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার এমপিওভুক্ত জালদিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সাতজন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টিতে ১০ জন শিক্ষক থাকলেও ফলাফল শূন্য। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কাজী এজাজ কায়সার জানান, সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উড়ির চর জুনিয়র হাইস্কুলের ১০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। আর্থিক সংকট ও শিক্ষকদের দুই বছর ধরে বেতন না পাওয়ার কারণে পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় এমন বিপর্যয় ঘটেছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ইসমত আরা বেগম জানান, প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হলেও সরকারি অনুমতি থাকায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।