দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষায় উচ্চ পাসের হারের প্রবণতা থাকলেও, গত দুই বছর ধরে ফলাফল ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হচ্ছে। সদ্য প্রকাশিত ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমার পাশাপাশি জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রায় ১৯ হাজার কমেছে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের দুর্বলতা সার্বিক পাসের হারে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কুমিল্লা বাদে বাকি আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি শীর্ষস্থানীয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেও ইংরেজির ফল আগের তুলনায় খারাপ হয়েছে; এবার সেখানে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ।
মানবিক বিভাগের ফলাফলও সামগ্রিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ। এ বিভাগে ছয় লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার তুলনায় পাসের হার অনেক কম। মানবিক বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার প্রায় ৪১ শতাংশ এবং ছাত্রীদের প্রায় ৫৪ শতাংশ। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৭৭ শতাংশের বেশি এবং ছাত্রীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ।
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার মোট ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমে যাওয়ায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। এছাড়া শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে ৫৭টিতে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছর ছিল ৪৮টি।
ফলাফলের সূচকে এবারও ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৮ হাজারের বেশি ছাত্রী এবং ৪৭ হাজারের বেশি ছাত্র। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। এবার জিপিএ-৫ ও পাসের হারের শীর্ষে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রশ্নের ধরন, প্রস্তুতি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতি ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে। দীর্ঘ ১০ বছর বিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনার পরও পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং ইংরেজি-গণিতে বড় দুর্বলতা বিদ্যালয়গুলোর শিখন মান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
এসএসসির পাসের হারে গত দুই দশকে বড় ওঠানামা হয়েছে। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে প্রায় ৭১ শতাংশে ওঠে। এরপর দীর্ঘ সময় পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে বা কাছাকাছি ছিল। গত বছর থেকে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৫ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এবার তা আরও কমে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন।
তবে এবারের ফলাফলকে খারাপ বলতে রাজি নন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গতকাল সোমবার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, এবারের ফল সুন্দর হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়া যায় না।’ একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে যে শিক্ষার্থী যেভাবে পড়াশোনা করেছে, নির্মোহভাবে সেভাবেই মূল্যায়ন হয়েছে।
গত তিন যুগে এসএসসির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন পদ্ধতি চালুর সময় থেকে ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৬১ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে ছিল। পরে প্রশ্নব্যবস্থায় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ২০০৭ সাল পর্যন্ত আবার পাসের হার কমে আসে। ২০০৮ সাল থেকে আবার পাসের হার বাড়তে শুরু করে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু পাস-ফেলের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।