আর্থিক সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দেওয়ার পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত তিন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এসব দুর্বল ব্যাংককে দেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর চরম তারল্য সংকট মোকাবিলায় এই অর্থ প্রদান করা হলেও দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও তারা এই বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে।
জানা গেছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডজনখানেকের বেশি ব্যাংকে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এস আলমসহ কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ এসব জালিয়াতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিল। লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে এই সংকট মোকাবিলায় টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংকট আরও প্রকট হলে সহায়তা অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা দেখা দিলে বাংলাদেশ ব্যাংককে পুনরায় এই সহায়তা দিতে হয়।
তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৩টি ব্যাংককে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ আমলের শেষ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, অন্তর্বর্তী সরকারের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময়ে ৫১ হাজার কোটি টাকা এবং বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সময়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, লুটপাটের কারণে সৃষ্ট এই সংকটে কেবল টাকা ছাপিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। কিছু ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে অগ্রগতি খুবই ধীর।
আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা গোপন রাখা হয়েছিল। ২০২২ সালের শেষ দিকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোর ঋণ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ্যে আসলে গ্রাহকরা আমানত উত্তোলনের হিড়িক শুরু করেন, যা ব্যাংকগুলোকে তারল্য সংকটে ফেলে দেয়। তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বিধিবদ্ধ নগদ তারল্য (সিআরআর) ও সরকারি সিকিউরিটিজ (এসএলআর) সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকগুলোকে অবৈধ সুবিধা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি বিতর্কিত ব্যাংকগুলোর চলতি হিসাব ঋণাত্মক করে লেনদেনের সুযোগও দেওয়া হয়েছিল। তবে নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব গ্রহণের পর এই বেআইনি সুবিধা বন্ধ করলেও, ব্যাংকের শাখায় শাখায় অস্থিরতা ও গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে না পারার চাপের মুখে তিনি আবারও টাকা ছাপিয়ে ঋণ দিতে বাধ্য হন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি ১৭ হাজার কোটি টাকা ধার পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২০ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংক ৪ হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ৩ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৬২৪ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ২৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংক ২৫২ কোটি এবং বেসিক ব্যাংক ১৯৫ কোটি টাকা পেয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই সহায়তা দিচ্ছে। তার মতে, আমানতকারীরা অর্থ ফেরত না পেলে ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে, যা সংকটকে আরও গভীর করবে। তবে এভাবে টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ঠিক হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ০৬আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ০৮