রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সাহাবিরা ছিলেন নবুয়তের ইলম ও শিক্ষার মূল ধারক ও বাহক। নবীজি (সা.)-এর জীবদ্দশায় কোনো বিষয়ে তাদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিলে তারা সরাসরি তাঁর কাছে চলে যেতেন এবং সমাধান পেয়ে যেতেন। তবে তাঁর ইন্তেকালের পর বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবিদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আলেমদের মধ্যে এই মতভিন্নতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মতপার্থক্য যতক্ষণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে, ততক্ষণ তা সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ; কিন্তু সীমা অতিক্রম করলে তা বিপর্যয় ডেকে আনে। সাহাবিদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে আমাদের জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
বনু কুরাইজা অভিযানের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘বনু কুরাইজায় না পৌঁছা পর্যন্ত কেউ আসরের নামাজ পড়বে না।’ পথিমধ্যে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেলে সাহাবিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একদল আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করে বলেন, বনু কুরাইজায় পৌঁছেই তারা নামাজ পড়বেন। অন্য দল মনে করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আসলে দ্রুত পৌঁছানোর তাগিদ দিয়েছিলেন, সময় মতো নামাজ আদায় না করতে বলেননি। ফলে তারা পথেই নামাজ আদায় করে নেন। বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উত্থাপন করা হলে তিনি কোনো দলের প্রতিই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি এবং কাউকে ভুল বলেননি (বোখারি: ৪১১৯)। মানুষের মধ্যে এমন মতপার্থক্য হতে পারে তা বিবেচনা করেই তিনি কাউকে নিন্দা করেননি।
আরেকটি ঘটনা জাতুস সালাসিল যুদ্ধের। সেই হাড় কাঁপানো শীতে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.)-এর এক রাতে স্বপ্নদোষ হয়। ফজরের নামাজের ইমামতি করার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডায় গোসল করলে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কায় তিনি গোসল না করেই তায়াম্মুম করে নামাজ পড়িয়ে দেন। এতে অন্য সাহাবিরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তখন আমর ইবনুল আস (রা.) পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।’ এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল হেসেছিলেন এবং তাঁকে কিছুই বলেননি (আবু دাউদ: ৩৩৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানেও যৌক্তিক ভিন্নমতকে নিন্দা না করে সুযোগ দিয়েছেন।
ইসলামের দুই মহান ব্যক্তিত্ব আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর মধ্যেও অনেক বিষয়ে ব্যক্তিগত মতের অমিল ও তর্কাতর্কি হতো। বদর যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) পরামর্শ চাইলে আবু বকর (রা.) তাদের ক্ষমা করে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন, যাতে তারা পরে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পায়। অন্যদিকে উমর (রা.) তাদের শিরচ্ছেদের কঠোর মত দেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের এই ভিন্নমতকে চারজন নবী—ইবরাহিম (আ.), ঈসা (আ.), নুহ (আ.) ও মুসা (আ.)-এর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করেন (মুসনাদে আহমাদ: ৩৬৩২)। নবীজি (সা.) আবু বকরের মত গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা সুরা আনফালের ৬৭ নম্বর আয়াতে উমরের মতকে সমর্থন করে ওহি নাজিল করেন। তা সত্ত্বেও উমর (রা.) কখনো আবু বকর (রা.)-কে এ নিয়ে খোটা দেননি, বরং তারা পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে একসঙ্গে কাজ করেছেন।
canবি বনু তামিম গোত্রের প্রতিনিধি নির্বাচনের সময় দুজনের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা হয় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনেই তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়ে যায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ সুরা হুজুরাতের ২ নম্বর আয়াত নাজিল করে সতর্ক করেন, যাতে কেউ নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজের কণ্ঠ উঁচু না করে। এই নির্দেশ আসার পর উমর (রা.) এত আস্তে কথা বলতেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তা শোনার জন্য দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে হতো (বোখারি: ৪৮৪৫)। সাহাবিদের এসব ঘটনা আমাদের শেখায় কীভাবে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং নিজেদের ভুল সংশোধন করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়।
উমর (রা.) মত দিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এরাই তো আপনাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে, এরাই তো আপনাকে অবিশ্বাস করছে। (এখন তাদেরকে কিসের ক্ষমা) সুতরাং, আপনি তাদের শিরচ্ছেদ করুন।’ দুজন সিনিয়র সাহাবি দুই ধরনের মত দিচ্ছেন। একজন বলছেন ক্ষমা করার কথা, তো আরেকজন বলছেন শাস্তি দেবার কথা। কিছুক্ষণ পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ কারও হৃদয়কে এতটা কোমল বানিয়েছেন যা দুধের মতো, আবার কারও হৃদয়কে এতটাই কঠিন বানিয়েছেন যা পাথরের মতো। আবু বকর, তুমি হলে ইবরাহিমের (আ.) মতো, যিনি বলেছিলেন, ‘যে আমার অনুসরণ করেছে নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ইবরাহিম : ৩৬)। আবার আবু বকর, তুমি হলে ইসার (আ.) মতো। যিনি বলেছিলেন, ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা মায়িদা : ১১৮)।