সরকার গঠনের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পরপরই মন্ত্রিসভায় প্রথম বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথগ্রহণের পরপরই নতুন তিনজন পূর্ণ মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে একজন প্রতিমন্ত্রীর পদোন্নতি ঘটিয়ে তাকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। এছাড়া একজন মন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন করা হয়েছে এবং একজনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই রদবদলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সরকারের ঘনিষ্ঠদের অনেকে একে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মমূল্যায়নের প্রাথমিক ফলাফল হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে কেবল কয়েকটি শূন্য পদ পূরণ, দপ্তর পুনর্বণ্টন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভায় আরেক দফা পরিবর্তন হতে পারে। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের আলোচনায় তা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন, কর্মকাণ্ড ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করছে। অর্থাৎ ছয় মাসের কর্মমূল্যায়ন শুরু হয়েছে—এ নিয়ে সংশয় নেই। তবে গত শুক্রবারের রদবদলকে সেই মূল্যায়নের পূর্ণাঙ্গ ফল বলা যাচ্ছে না। কোন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী কোন সূচকে ভালো বা খারাপ করেছেন, মূল্যায়নের মানদণ্ড কী ছিল এবং কার দপ্তর কেন বদলানো হলো—সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কিছু বলা হয়নি।
এই পরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। মন্ত্রিসভার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রয়েছেন ১০ জন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের রদবদলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে মন্ত্রিসভার কাঠামো নিয়ে। সম্প্রসারণ ও দপ্তর পুনর্বণ্টনের পর কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে একই সঙ্গে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও একই মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রয়েছেন। তুলনামূলক ছোট কয়েকটি মন্ত্রণালয়েও রাখা হয়েছে পূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। এর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃচ্ছ্রসাধনের প্রশ্ন। ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়িতা সরকার ও প্রশাসনে একটা ইতিবাচক বার্তা দিলেও মন্ত্রিসভার আকার বেড়ে যাওয়ায় সেই বার্তার কিছুটা বৈপরীত্য নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
সর্বশেষ পরিবর্তনের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গে দুজন প্রতিমন্ত্রী রাখা হয়েছে। এক মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী আগে দেখা যায়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রী আছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। নতুন যুক্ত হলেন হুমায়ুন কবির। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের কাজের গতি বাড়াতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেস্কে মন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক প্রতিমন্ত্রী থাকতে পারেন। এটি বিভিন্ন দেশের সরকারব্যবস্থায় আছে। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সাচিং প্রু জেরীকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। সেখানে আগে থেকেই মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়েও মন্ত্রী হিসেবে আগে থেকে আছেন কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। সেখানে নতুন প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে মোহাম্মদ শামীম কায়সারকে। তাঁকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামসহ এই ঘরানার আলেমরা ইতিমধ্যে আপত্তি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। এটাকে রাজনৈতিক অংশীদারত্বের প্রতিফলন হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ। যদিও এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনের মতো বড় তিনটি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী একজন—শেখ রবিউল আলম। তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন দুজন—হাবিবুর রশিদ ও মো. রাজীব আহসান। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অপেক্ষাকৃত ছোট মন্ত্রণালয় হলেও এখানে একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার একজন উপদেষ্টা রয়েছেন। পাশাপাশি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ে সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর একজন বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান রয়েছেন।
মন্ত্রিসভায় রদবদলের পরপর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, নির্দিষ্ট সময় পর মন্ত্রিসভার কার্যক্রমের মূল্যায়ন হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রদবদল করা হবে। ভবিষ্যতেও আবার মূল্যায়ন হবে এবং মন্ত্রিসভায় আরও পরিবর্তন আনা হতে পারে। সামনে নতুন সদস্য যুক্ত হলে বর্তমান মন্ত্রিসভা অতীতের বড় তিনটি মন্ত্রিসভার আরও কাছাকাছি চলে যেতে পারে। ১৯৯১ সালের পর রাজনৈতিক সরকারগুলোর মধ্যে বর্তমান ৫১ সদস্যের মন্ত্রিসভার চেয়েও বড় ছিল তিনটি মন্ত্রিসভা। ২০০৯-১৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় ৬২ জন ছিলেন। ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা ছিল ৬০ সদস্যের এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৪-১৯ মেয়াদে ছিল ৫৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন বা দপ্তর পুনর্বণ্টন করা প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার এবং এটি সরকারের রুটিন কাজ।