পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে গত শুক্রবার শপথ গ্রহণ করেছেন হুমায়ুন কবির। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকা না থাকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সিলেটে জন্মগ্রহণ করলেও মাত্র আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান হুমায়ুন কবির। সেখানে বেড়ে ওঠা ও উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এক পর্যায়ে দেশটির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ ধারায় বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদিগকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, তাঁহাদের সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ-সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন।’ অর্থাৎ নির্বাচিত সংসদ সদস্য নন, এমন ‘অনধিক এক-দশমাংশ’ (১০ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ জনকে) ব্যক্তিকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী করা যায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি হুমায়ুন কবির তাঁর সাধারণ পাসপোর্ট (সবুজ) জমা দেন এবং একই মাসে লাল পাসপোর্ট (সরকারি বা কূটনৈতিক) গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করে সৌদি আরবসহ অন্তত ১১ বার বিদেশ সফর করেছেন। তবে যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন যে তিনি ব্রিটিশ নাগরিক, কিন্তু প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ বা রিনাউন্স করেছেন কি না, তা তাঁরা নিশ্চিত করতে পারেননি। সরকারি সূত্রগুলোও জানিয়েছে, হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন জানিয়েছেন—এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য শনিবার বেশ কয়েকবার হুমায়ুন কবিরকে ফোন করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সংবিধানের ৬৬ ধারার ২(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হন না। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন, সাংবিধানিকভাবে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না বা আবেদন করেছেন কি না, তা জাতি জানে না। কেবল আবেদন করলেই নাগরিকত্ব ত্যাগ হয় না, সংশ্লিষ্ট দেশের যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। এসব বিষয় স্পষ্ট না করেই তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন থেকে যায়।
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। একইভাবে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব থাকায় বরিশাল-৪ (মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলা) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহম্মেদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম হকের নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
হুমায়ুন কবিরের শিক্ষাজীবনের তথ্যে দেখা যায়, তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ ও লিডস ল স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি লন্ডনে মেয়রের দপ্তরসহ ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লেবার পার্টির বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো শাখার সেক্রেটারি ছিলেন এবং ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হিসেবে দায়িত্ব পান।