স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমি হোম মিনিস্টার। আমি নিজেই এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের শিকার। আমি চাইব না বাংলাদেশে আর কেউ গুম হোক। আমরা এমন একটি আইন চাই, যাতে প্রত্যেক ভুক্তভোগী আদালতে যেতে পারে, বিচার পায় এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত হয়। শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস উপলক্ষে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রথম অধিবেশনে গুম কমিশন অধ্যাদেশ পাশ করা হয়নি, কারণ শুধু কমিশন গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকার এমন একটি আইন সংসদে এনেছে, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার সরাসরি আদালতে গিয়ে বিচার চাইতে পারবে। তিনি বলেন, গুম কত প্রকার, কোন অপরাধে কী শাস্তি হবে, তদন্ত করবে কারা, ভুক্তভোগীর কী কী অধিকার থাকবে—সবই আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে না পাওয়া গেলে তার উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির অধিকার পাবেন এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও থাকবে। সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, এই আইন নিয়ে যাদের মতামত আছে, তারা সংসদীয় কমিটিতে দিতে পারেন। আইন সংশোধনের সুযোগ সব সময় থাকবে। আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই।
র্যাব প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার বাহিনীটি বিলুপ্ত না করে জবাবদিহিমূলক সংস্কারের পথ নিয়েছে। তিনি বলেন, আধুনিক সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় একটি এলিট ফোর্স দরকার। তবে আমরা তাদের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। তিনি দাবি করেন, গত ছয় মাসে সরকার একটি ‘ভঙ্গুর বাহিনী’ উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেও তাদের মনোবল ও নৈতিকতা পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
নিজের ৬১ দিনের গুমের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমার গুমের ৬১ দিন—তার যতটা মিনিট, যতটা মুহূর্ত কেটেছে, তার প্রত্যেকটা যদি আমি লিখে রাখতে পারতাম, তাহলে জাদুঘরের সংকলন হতো কোনো কিতাব। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতো যে আগামী ভোর কি আমি দেখব? সকালের নাশতা দেওয়া হলে বুঝতাম সকাল হয়েছে। আর নখের দাগ দিয়ে দেয়ালে সংখ্যা লিখে লিখে দিন গুনতাম। তিনি জানান, তাকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল সেটি ছিল অত্যন্ত ছোট, আনুমানিক পাঁচ ফুট বাই দশ ফুটের মতো। সেখানে একটি কম্বল ও পাতলা একটি বালিশ ছাড়া তেমন কোনো সুবিধা ছিল না। কক্ষের এক কোণে প্রস্রাব-পায়খানার ব্যবস্থা ছিল, যেখান থেকে দুর্গন্ধ আসত।
বক্তব্যে গুমের পর তাকে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় গাড়িতে করে নেওয়ার পর তাকে একটি নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তাকে ফুটপাতে দাঁড় করিয়ে রেখে বলা হয়েছিল, ‘ইউ আর ফ্রি নাও।’ পরে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তিনি পুলিশকে খবর দেওয়ার অনুরোধ করেন। পুলিশ এসে তাকে একটি বিট হাউসে নিয়ে যায় এবং পরে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের সহায়তায় দেওয়া ফোন নম্বরের মাধ্যমে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। তার স্ত্রী বিদেশি নম্বর থেকে আসা কলটি ব্যাক করেন এবং হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বলেন, ‘আমি জানতাম তুমি বেঁচে আছো।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে হাস্যরস না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে আন্ডারমাইনিং করার একটা প্রবণতা আমরা গত দুই বছর দেখছি। এটা অনেকটা অপকালচারে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি বেঁচে আছি, হুম্মাম বেঁচে আছে, আরমান বেঁচে আছে। আমরা কি জানতাম আমরা বেঁচে থাকব? বেঁচে থাকাটাকে নিয়ে হাস্যরস করা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে হতাশাগ্রস্ত করবে। গুমবিরোধী আইনটি ভবিষ্যতেও কার্যকর থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা আজকে সরকারে আছি, আগামীতে তো নাও থাকতে পারি। কিন্তু এই আইনটা থাকবে। এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের শিকার যেই হোক, সে বিচার পাবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাম্য, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের জন্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্র আংশিকভাবে মানার বিষয় নয়। বিরোধী মতকে দমন করার মানসিকতাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেয়।
সংসদ সদস্য ও গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর দাবি মাত্র তিনটি—জবাবদিহি, বিচার ও ক্ষতিপূরণ। তিনি নতুন গুম প্রতিরোধ আইনের ১৪, ১৯ ও ২১ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেন, স্বাধীন তদন্ত কমিশন ছাড়া নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়। পাশাপাশি পাঁচ মাস ধরে নিখোঁজ মিরাজ শেখের ঘটনায় অবিলম্বে স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানান তিনি। এ সময় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, শহীদুল আলম, তানজিম ওয়াহাব, নূর খান লিটন এবং নাজমুল আহসান। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি।