২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর (3 September 2026) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম কমার আশায় দরপত্র বাতিল করে নতুন করে প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে পেট্রোবাংলা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে সরকারের অতিরিক্ত ১২৩ কোটি টাকা লোকসান বা গচ্চা গেছে। সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের জন্য স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি এলএনজি কার্গো আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। তবে স্বস্তির খবর হলো, আমদানিকৃত এই গ্যাস দেশে পৌঁছালে আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের পর দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই চারটি এলএনজি কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সৌদি আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২৩ দশমিক ৯৮ ডলার মূল্যে এক কার্গো এলএনজি কিনবে পেট্রোবাংলা। এছাড়া স্পট মার্কেট থেকে কেনা হবে বাকি তিনটি কার্গো। এর মধ্যে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে প্রতি ইউনিট ২৭ দশমিক ৫৪ ডলারে এক কার্গো এলএনজি কেনা হচ্ছে, যার মোট ব্যয় দাঁড়াবে ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। ১-২ অক্টোবরের জন্য বিপি সিঙ্গাপুর থেকে প্রতি ইউনিট ২৮ দশমিক ০৩ ডলারে কেনা কার্গোটির আমদানি মূল্য পড়বে ১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া ৫-৬ অক্টোবরের জন্য ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলারে কেনা অপর কার্গোটির আমদানি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর এবং ৫-৬ অক্টোবরের সরবরাহের জন্য গত সোমবার স্পট মার্কেটে প্রথম দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ওই দরপত্রে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য বিপি সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক 6২ ডলার এবং ৫-৬ অক্টোবরের জন্য ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক ৫০ ডলার দরপ্রস্তাব করেছিল। কিন্তু এই দাম বেশি মনে হওয়ায় আরও সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়ার আশায় পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ সেই দরপত্র বাতিল করে দেয়। পরদিন মঙ্গলবার পুনরায় দরপত্র ডাকা হলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম এক লাফে বেড়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের কার্গোটি আরামকোর কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২৭ দশমিক ৫৪ ডলারে এবং ৫-৬ অক্টোবরের কার্গোটি ভিটল এশিয়ার কাছ থেকেই ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে। দরপত্র বাতিলের এই সিদ্ধান্তের কারণে দুই কার্গোতেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ১ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১২৩ কোটি টাকা। এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সোমবারের টেন্ডারটি সৎ উদ্দেশ্যেই বাতিল করা হয়েছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও তীব্র হওয়ায় দ্বিতীয়বারের টেন্ডারে উল্টো ক্ষতি গুণতে হয়েছে।
এদিকে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং বজায় রাখবে পেট্রোবাংলা। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে 'ব্ল্যাক কিউব' নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হলেও তারা গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। এমনকি স্পট মার্কেটে দুবার দরপত্র ডেকেও ওই সময়ের জন্য কোনো বিকল্প সরবরাহকারী মেলেনি। তবে ১০ সেপ্টেম্বর আরামকোর এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছালে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশজুড়ে দৈনিক ২৩৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা ১০ সেপ্টেম্বরের পর ২৪৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হতে পারে বলে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে।
পেট্রোবাংলা আরও জানায়, গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে আমদানির শিডিউলে বিপর্যয় দেখা দেয়। গত ৬ আগস্ট টার্মিনালটি মেরামত করা হলেও গ্যাস সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। অতীতে দেশের দুটি টার্মিনাল থেকে দৈনিক গড়ে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা কমে গড়ে ৭১ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। তবে আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের পর এই সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক ৯০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বুধবার দুপুরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে চার কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন হয়। এর মধ্যে ১০ সেপ্টেম্বর স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সৌদি আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট এলএনজি ২৩ দশমিক ৯৮ ডলারে কিনছে পেট্রোবাংলা। এছাড়া স্পটে ৩টি কার্গো কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে প্রতি ইউনিট ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার (এই কার্গো গ্যাসের দাম পড়বে ১১৬৫ কোটি টাকা), ১-২ অক্টোবর বিপি সিঙ্গাপুর থেকে প্রতি ইউনিট ২৮ দশমিক ০৩ ডলার (এই কার্গোর আমদানি মূল্য ১১৮৫ কোটি টাকার বেশি) এবং ৫-৬ অক্টোবর ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলারে (এই কার্গো এলএনজি আমদানি ব্যয় প্রায় ১১৩০ কোটি টাকা) কেনা হচ্ছে।
যে কারণে গচ্চা ১২৩ কোটি টাকা : জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, আগামী ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর এবং ৫-৬ অক্টোবর এলএনজি সরবরাহের জন্য গত সোমবার স্পট মার্কেটে দরপত্র ডাকা হয়েছিল। ২৫-২৬ তারিখের জন্য বিপি সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিট ২৫.৬২ ডলার এবং ৫-৬ অক্টোবরের জন্য ভিটল এশিয়া ২৫.৫০ ডলার দর দিয়েছিল। দাম বেশি মনে হওয়ায় আরও কম দামে পাওয়ার আশায় ওই দরপত্র বাতিল করে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ। তবে মঙ্গলবার পুনরায় দরপত্র ডাকা হলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তারের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য আরামকোর কাছ থেকে ২৭.৫৪ ডলারে এবং ৫-৬ অক্টোবরের জন্য সেই ভিটল এশিয়ার কাছ থেকেই ২৬.৬৬৮ ডলারে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে শুধু এই দুই কার্গোতেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে এক কোটি ডলার বা প্রায় ১২৩ কোটি টাকা। এ বিষয়ে মন্তব্য নিতে বারবার চেষ্টা করেও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।