১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহ জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় এখানে আত্মহননের হার অনেক বেশি। বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই জেলায় প্রতি বছর গড়ে সাড়ে তিনশত মানুষ নিজের জীবন শেষ করে দিচ্ছেন। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ঝিনাইদহে ১৮৯ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন, যাদের মধ্যে ৯২ জন পুরুষ এবং ৯৭ জন নারী ছিলেন।
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঝিনাইদহে এই ব্যাধি দীর্ঘদিনের। ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত জেলা পুলিশের দপ্তরে আত্মহত্যার কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড না থাকলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ওই সময়ে আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২৫ হাজারের কাছাকাছি। পরবর্তী সময়ে ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে জেলায় ৩,১৫২ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন এবং একই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান আরও ২২ হাজার ৬৭ জন।
বছরভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ২০১০ সালে জেলায় ৩৮০ জন আত্মহত্যা করেন এবং ২,১০৯ জন চেষ্টার পর বেঁচে যান। ২০১১ সালে ৩০৯ জন আত্মহত্যা ও ২,৮৪৯ জন চেষ্টা করেন। ২০১২ সালে ২৯৫ জন আত্মহত্যা ও ২,৫৮৩ জন চেষ্টা করেন। ২০১৩ সালে ৩১১ জন আত্মহত্যা ও ২,৬৩৯ জন চেষ্টা করেন। ২০১৪ সালে ৩০৩ জন আত্মহত্যা ও ২,৪০৯ জন চেষ্টা করেন। ২০১৫ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬৩ জনে এবং চেষ্টা করেন ২,৬০০ জনের বেশি মানুষ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২০ সালে ঝিনাইদহে ৩২০ জন আত্মহত্যা করেন, যার মধ্যে ৪৭ শতাংশ অর্থাৎ ১৫১ জন ছিলেন পুরুষ এবং ১৬৯ জন নারী। ২০২২ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ৩২৩ এবং ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ৩২৮-এ। ২০২৪ সালে মোট ৩১৯ জন আত্মহত্যা করেন, যার মধ্যে ১৫২ জন পুরুষ ও ১৬৭ জন নারী ছিলেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে মোট ৩০১ জন আত্মহত্যা করেন, যাদের মধ্যে ১৬৮ জন নারী এবং ১৩৩ জন পুরুষ। গত চার বছরে জেলায় মোট ১,২৭১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন, যেখানে নারীদের সংখ্যাই বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মাঝেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পারিবারিক কলহ, মানসিক অশান্তি, কীটনাশকের সহজলভ্যতা, মাদকাসক্তি ও বেকারত্বকে এই আত্মহননের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে শৈলকূপা উপজেলায় আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা 'সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাকটিভিটিজ-শোভা' দীর্ঘ দিন ধরে এই অঞ্চলে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করছে। সংস্থাটি ঝিনাইদহ জেলাকে আত্মহননের দিক থেকে 'লাল তালিকায়' রেখেছে। শোভার নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলের মানুষের রাগ ও অভিমান তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ না থাকায় এখানকার মানুষের মানসিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বা সহ্যক্ষমতা কম গড়ে উঠেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এটি প্রতিরোধ সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তপন কুমার রায় জানান, আবেগই এই অঞ্চলে আত্মহত্যার মূল কারণ। জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা মানুষদের রক্ষায় সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুর রহমান পাপ্পু বলেন, তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সভা-সেমিনারের মাধ্যমে মানুষকে এই নেতিবাচক পথ থেকে ফিরে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন।
ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুমা জামান কাকলি বলেন, জীবনকে উপভোগ করতে হবে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আত্মহত্যা মানে জীবনের যুদ্ধে পরাজয় মেনে নেওয়া। অন্যদিকে, বেকারত্বের হতাশায় ২০২২ সালে বিষপান করে বেঁচে যাওয়া কামারকুণ্ডু গ্রামের অটোরিকশা চালক সোবহান মোল্লা এখন নতুন করে বাঁচার আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
ঝিনাইদহের police সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান জানান, দণ্ডবিধি অনুযায়ী আত্মহত্যা বা এর চেষ্টা করা একটি অপরাধ। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে জেলা পুলিশ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, সামাজিক সচেতনতাই এই ব্যাধি প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।