দেশে দীর্ঘ দেড় মাসের বেশি সময় ধরে চলা তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রোববার পুনরায় চালু হয়েছে। একই সঙ্গে আজ সোমবার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দেশের বড় তিনটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন হওয়ায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও লোডশেডিং পুরোপুরি সহনীয় হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে বলে জানা গেছে।
গ্যাসের তীব্র সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিং যেমন বেড়েছে, তেমনি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং রান্না ও পরিবহনে মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ বিষয়ে জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে এবং এতে শিল্পসহ সব খাতের গ্রাহকদের গ্যাস প্রাপ্তি বাড়বে। তিনি আরও বলেন, কয়লাচালিত কয়েকটি কেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি না দেখা দিলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির আরও দ্রুত উন্নতি হতো। তবে দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির ধারাবাহিক উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, এলএনজি কার্গো আমদানি কম থাকায় এতদিন সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে এখন নিয়মিত কার্গো আসতে শুরু করায় সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হচ্ছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সাধারণত ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। গত রোববার সরবরাহ করা হয়েছিল ২৩৭ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে ৭৫ কোটি ঘনফুট এসেছে এলএনজি থেকে। আজ সোমবার থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে ৯৩ কোটি ঘনফুট করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে মোট গ্যাস সরবরাহ দাঁড়াবে ২৫৫ কোটি ঘনফুটে। এর ফলে শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানান, বিশ্ববাজারে এলএনজি কার্গোর সরবরাহ কম থাকা সত্ত্বেও চাহিদামতো আমদানি করা হচ্ছে। সোমবার থেকেই সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে এবং দ্রুতই গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। উল্লেখ্য, দেশে গত ৯ বছর ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকায় ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি ও দেশীয় সামিট গ্রুপের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। গত ২১ জুলাই এক অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায় এবং দীর্ঘ ২৫ দিন পর ১৫ আগস্ট এটি পুনরায় চালুর জন্য প্রস্তুত হলেও নতুন কার্গোর অভাবে সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছিল না।
সাধারণত প্রতি মাসে গড়ে ১০টি এলএনজি কার্গো আনা হলেও এবার জুলাই-আগস্টে চাহিদার তুলনায় কম কার্গো এসেছে। গত বছর এই সময়ে ২১টি কার্গো এলেও এবার এসেছে মাত্র ১৫টি। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আগস্টে আসার কথা থাকা ৪টি কার্গোর একটিও আসেনি এবং চলতি মাসেও আসার সম্ভাবনা কম। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকেও সরবরাহ না আসায় খোলাবাজার থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে ১০টি কার্গো আনার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৯টি কার্গো নিশ্চিত করা গেছে। এর মধ্যে আরামকোর দুটি ও ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি কার্গো ইতিমধ্যে এলএনজি সরবরাহ করেছে। কোরিয়ান কোম্পানি পস্কোর একটি কার্গো আজ সোমবার সকালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে গানভর, আরামকো ও টোটাল এনার্জির কার্গোগুলো পৌঁছাবে।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং শীতের আগে ইউরোপের বাড়তি চাহিদার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম গত ছয় মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত জানুয়ারিতে এশিয়ার স্পট বাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১০ থেকে ১১ ডলার থাকলেও সেপ্টেম্বরে তা ২৮ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যেই অক্টোবরের জন্য ৬টি কার্গো নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আরও ৫টি কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এদিকে কয়লাস্বল্পতায় এক মাস ধরে সীমিত উৎপাদনে থাকা আদানির ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির একটি ইউনিট গত বুধবার রাতে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশে লোডশেডিং আরও তীব্র হয়। তবে গতকাল রোববার দুপুর ১২টায় আদানির দ্বিতীয় ইউনিটটি পুনরায় চালু করা হয় এবং সন্ধ্যা নাগাদ সেখান থেকে সরবরাহ বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
আদানির কেন্দ্রটি চালুর পরপরই গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় কারিগরি কারণে বাগেরহাটের রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা এই কেন্দ্রের উৎপাদন কমে ৬৫৭ মেগাওয়াটে নেমে আসে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আনোয়ারুল আজিম জানিয়েছেন, এই ইউনিটটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে অন্তত চার দিন সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ৫৭০ মেগাওয়াট এবং একই জেলার অন্য একটি কেন্দ্রে কয়লা সংকটের কারণে উৎপাদন ৪০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে এই দুটি কেন্দ্র মিলিয়ে উৎপাদন কমেছে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শনিবার রাত ১২টায় দেশে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি এবং রোববার দিনে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, টানা চালু রাখার কারণে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিচ্ছে এবং এগুলো দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি তেলের আমদানি ও সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে এবং ২০ সেপ্টেম্বরের পর তেলের সরবরাহ আরও বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।
তবে ওই দিন একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন কমে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।
প্রতিটি কেন্দ্র ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতায় নির্মিত হয়।