নতুন অর্থবছরের শুরুতেই কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়ে গতি দেখা যাচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো ২ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণ করেছে। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সাড়ে ২৩ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো ৩ হাজার ৫২১ কোটি টাকা আদায় করেছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। দেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য কমাতে এ খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ কৃষি খাত থেকে আসে এবং প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এ কারণে অগ্রাধিকার খাত বিবেচনায় প্রতি বছরই কৃষি খাতে ঋণের জোগান বাড়াতে ব্যাংকগুলোর জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। নতুন নীতিমলায় ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছর পর্যন্ত একটি ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত আড়াই শতাংশ কৃষিতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই নতুন কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালার প্রধান উদ্দেশ্য। বিশেষ করে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতে আয়-উৎসারী কর্মকাণ্ড এবং কৃষি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো কৃষিতে ২ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। এটি পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই মাসে বিতরণ হয়েছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ সময়ে কৃষিঋণ বিতরণে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। তারা ১ হাজার ১১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বিতরণ করেছে, যা মোট বিতরণের ৪১ দশমিক ৮১ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৬৮৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বা ২৫ দশমিক ৮২ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলো দিয়েছে ৫৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা বা ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ২৮৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। তবে জুলাইয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কোনো কৃষিঋণ বিতরণ হয়নি।
খাতভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে কৃষিঋণের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে শস্য উৎপাদনে। এ খাতে বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ৭৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণের ৪০ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এরপর প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতে ৯২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বা ৩৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং মৎস্য খাতে ৩৮৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বা ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বিতরণ হয়েছে। এ ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন খাতে ১২২ কোটি ৩ লাখ টাকা, অন্যান্য খাতে ১১৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, সেচ সরঞ্জাম খাতে ১১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, কৃষি সরঞ্জাম খাতে ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং শস্য সংরক্ষণ ও বিপণন খাতে ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। জুলাইয়ে মোট অকৃষি পল্লীঋণ বিতরণ হয়েছে ২৩৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণের ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
ঋণ বিতরণের পাশাপাশি জুলাইয়ে কৃষিঋণ আদায়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো ৩ হাজার ৫২০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা কৃষিঋণ আদায় করেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে আদায় বেড়েছে ৫৬৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বা ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ। তবে ঋণ আদায় বাড়লেও আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। জুলাইয়ে ব্যাংকগুলোর আদায়যোগ্য কৃষিঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। গত বছরের জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৪৮২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আদায়যোগ্য ঋণ বেড়েছে ৯৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষিঋণের বকেয়া বা ওভারডিউ কমেছে। গত বছরের জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ওভারডিউ ছিল ২৩ হাজার ৮০৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৩৬৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ওভারডিউ কমেছে ১ হাজার ৪৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বা ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এদিকে কৃষিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণে খেলাপি ছিল ১৯ হাজার ৮৮৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা কমে হয়েছে ১৮ হাজার ৮১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কৃষিঋণে খেলাপি কমেছে ১ হাজার ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন অর্থবছরের জুলাইয়ে কৃষিঋণ বিতরণের সূচনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভালো হয়েছে। তবে কৃষিঋণের বড় অঙ্কের বকেয়া ও খেলাপি ঋণ থাকায় ঋণ আদায়ের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও কৃষিঋণ বিতরণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল ব্যাংকগুলো। ওই অর্থবছরে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। একই অর্থবছরে কৃষিঋণ আদায়ের পরিমাণ ছিল ৪৫ হাজার ৬২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে গত অর্থবছর শেষে ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণের বকেয়া বা ওভারডিউ ছিল ১৯ হাজার ৮০৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আর কৃষিঋণে খেলাপির পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।