প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৪৪
মানুষের চিরন্তন প্রবৃত্তি হলো ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা যখন উন্মত্ততায় রূপ নিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘবদ্ধ জনতার হামলা বা ‘মব জাস্টিস’ আমাদের সমাজে এক মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে ‘ডি-ইন্ডিভিজুয়েশন’ বলা হয়, যেখানে দলবদ্ধ মানুষ নিজের ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও বিচারবোধ হারিয়ে ফেলে। উত্তেজিত জনতার এই ধ্বংসাত্মক আচরণ কোনোভাবেই বিচার নয়, বরং এটি একটি যৌথ অপরাধ। আবেগতাড়িত হয়ে মানুষের বিচারকের আসনে বসা কখনো সত্যের উন্মোচন করতে পারে না। অন্যায় রুখে দেওয়ার নামে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ইসলামি শরিয়ত ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনোভাবেই সমর্থন করে না।
ইসলামি জীবনদর্শনে মানুষের জীবন ও জানমালের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘হত্যার অপরাধ কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সৃষ্টির কারণ ছাড়া কেউ যদি কাউকে হত্যা করে, তবে সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।’ ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মক্কা বিজয়ের মতো চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তেও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন এবং যেকোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক সহিংসতাকে কঠোরভাবে দমন করেছিলেন। অথচ উত্তেজিত জনতা যখন কোনো ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করে, তখন তারা আল্লাহর এই অলঙ্ঘনীয় বিধানকেই অমান্য করে। অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাকে হত্যা করা মূলত একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যা আল্লাহর নির্ধারিত সীমার চরম লঙ্ঘন।
মব জাস্টিস বা গণপিটুনির পেছনে বড় ভূমিকা রাখে যাচাই-বাছাই ছাড়া ছড়িয়ে পড়া গুজব। বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে গুজব অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য খবরের চেয়ে মিথ্যা বা গুজব ছয় গুণ দ্রুত ছড়ায়। ইসলামে যেকোনো তথ্য যাচাইয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সুরা আল-হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কোনো ফাসেক বা অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি সংবাদ নিয়ে আসলে তা যেন ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া হয়। কিন্তু উত্তেজিত জনতা গুজবের স্রোতে ভেসে সত্যতা যাচাই না করেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অনেক নিরীহ মানুষের প্রাণ যায় এবং পরিবার ধ্বংস হয়। একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে ওঠে যাচাইকৃত সত্যের ওপর ভিত্তি করে।
একটি সভ্য সমাজে বিচারকার্য পরিচালনার একক দায়িত্ব নির্দিষ্ট ও যোগ্য কর্তৃপক্ষের। ইসলামি বিচারব্যবস্থায় প্রমাণের মানদণ্ড এতটাই কঠোর যে, খলিফা আলী (রা.)-কে একজন সাধারণ ইহুদি নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে কাজি শুরাইহের আদালতে সাধারণ ফরিয়াদির মতো উপস্থিত হতে হয়েছিল এবং উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তিনি মামলায় হেরে যান। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, অভিযোগকারী, বিচারক এবং শাস্তি প্রদানকারী কখনো এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হতে পারে না। অথচ মব জাস্টিসের ক্ষেত্রে জনতাই একই সঙ্গে অভিযোগ আনে, রায় দেয় এবং তা কার্যকর করে—যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। শাস্তি দেওয়ার একমাত্র অধিকার রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার; সাধারণ মানুষের দায়িত্ব কেবল সন্দেহভাজনকে অক্ষত অবস্থায় আইনের হাতে সোপর্দ করা।
এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি এবং আইনের শাসনকে শক্তিশালী করতে হবে। যেসব সমাজে বিচারব্যবস্থা দ্রুত ও কার্যকর, সেখানে মব জাস্টিসের প্রবণতা থাকে না বললেই চলে। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত মহানবীর (সা.) ধৈর্য, সহনশীলতা ও সুবিচারের আদর্শকে জীবনে ধারণ করা। উন্মত্ত জনতার সাথে সুর মিলিয়ে আঘাত করার মাঝে কোনো বীরত্ব নেই; বরং একটি নিষ্পাপ প্রাণ বাঁচাতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সেই উন্মত্ত জনতার সামনে রুখে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত বীরত্ব।