মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে বহু শিল্পকারখানা বন্ধ এবং দেশজুড়ে লোডশেডিং চলছে। এই নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং দেশবাসীকে আশার আলো দেখাতে সরকার ২০৩০ (2030) সালের মধ্যে নতুন ১০ হাজার (10000) মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মাত্র ১ হাজার ৭০০ (1700) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলো এই খাতে অনেক এগিয়ে। পাকিস্তানে ইতিমধ্যে ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ৬ হাজার (6000) মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে, যা তাদের বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন (12 billion) ডলার সাশ্রয় করছে। ভারতে নবায়নযোগ্য উৎস (সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা ২ লাখ ৭৪ হাজার (274000) মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে কেবল সৌরবিদ্যুৎ থেকেই আসছে দেড় লাখ (150000) মেগাওয়াটের বেশি। এমনকি ভিয়েতনামও তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মেটাচ্ছে।
বাংলাদেশের ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (স্রেডা) তাদের ‘ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপ’ (২০২১-২০৪১) বা (2021-2041)-এ ৩০ হাজার (30000) মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ অর্জনের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে ১২ হাজার (12000) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে আহরণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে রোডম্যাপ ঘোষণার কয়েক বছর পার হলেও উপযুক্ত কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ও মফস্বল শহরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ছাদ ব্যবহার করে ৭ থেকে ৮ হাজার (7000-8000) মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এ জন্য সোলার প্যানেল ও ব্যাটারিতে ভর্তুকি, যন্ত্রপাতির শুল্ক হ্রাস এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।
ভারতে ২০২৪ সালে সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য ‘পিএম সূর্য ঘর যোজনা’ (রুফটপ সোলার যোজনা) চালু করা হয়েছে। ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল স্থাপনে সেখানে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে দেড় লাখ রুপি খরচ হয়, যার মধ্যে ভারত সরকার সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার রুপি পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়। মোট ১ কোটি পরিবারকে এই যোজনার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের, যা সরাসরি বাংলাদেশেও প্রয়োগ করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৭ হাজার (27000) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা থাকলেও আমদানিনির্ভর এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক মেগা প্রকল্পের কারণে দৈনিক উৎপাদন মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার (13000-14000) মেগাওয়াটে সীমিত। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হবে মাত্র ৪২ (42) ডলার, যেখানে এলএনজিচালিত প্ল্যান্টে ৯৪ (94) ডলার এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে ১১৮ (118) ডলার খরচ পড়বে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিএনপি সরকারের লক্ষ্যমাত্রায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর জারিকৃত সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ (2027) সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে যেসব গ্রাহক ছাদভিত্তিক সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবেন, তাদের কাছ থেকে তিন বছর চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কিনে নেওয়া হবে। বিদ্যমান নেট এনার্জি মিটারিং পদ্ধতিতে বিতরণ সংস্থাগুলো এই বিদ্যুতের হিসাব রাখবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর প্রণোদনার অর্থ দেওয়া হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র অনুযায়ী, ছাদে উৎপাদন হবে ৫৫০০ (5500) মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক উৎপাদন হবে ৪৫০০ (4500) মেগাওয়াট। তবে সরকারি-বেসরকারি আবাসিক ও শিল্প খাতের ভবনের ছাদ ব্যবহার করে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অ্যাক্টিভিস্ট, ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের প্রসারে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার তিনটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ৫০০ (1500) কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ৫০০ (500) কোটি টাকা করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া হবে, যা থেকে তারা গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, এই ১৫০০ (1500) কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১০০০ (1000) কোটি টাকা ২০২৬-২৭ (2026-27) অর্থবছরের বাজেটে মাইক্রো-স্মল-মিডিয়াম বা এমএসএমই (MSME) খাতের জন্য সংরক্ষিত থাকা বরাদ্দ থেকে পুনর্বিন্যাস করা হবে এবং অবশিষ্ট ৫০০ (500) কোটি টাকা পরিচালন ঋণ থেকে সংস্থান করা হবে।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৫-২০৩০ (2025-2030) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সহজ শর্তে ও দীর্ঘমেয়াদে অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকার অংশগ্রহণকারী তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মাত্র ০.৫ শতাংশ বার্ষিক সুদে ১০ বছর মেয়াদি ঋণ দিচ্ছে, যার মধ্যে ১ বছরের গ্রেস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে এই ঋণের অর্থ কোনোভাবেই পুরনো ঋণ পরিশোধ, শেয়ার বা জমি ক্রয়, ব্যক্তিগত ভোগ কিংবা প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে না।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক-কর ব্যাপক হারে কমিয়েছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গত ১৬ সেপ্টেম্বরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এসব সরঞ্জাম আমদানিতে মোট করভার ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হয়েছে। এই সুবিধা বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্যও শর্তসাপেক্ষে প্রযোজ্য হবে এবং প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ১৮০ (180) দিন কার্যকর থাকবে। এর আগে ২০২৬-২৭ (2026-27) অর্থবছরের বাজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করে সৌরবিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানিতে আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক ও আগাম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে ১৫ শতাংশ মূসক ও ২ শতাংশ অগ্রিম আয়করসহ মোট করভার ছিল ১৭ শতাংশ। নতুন সিদ্ধান্তে এই করভার ১ শতাংশে নামিয়ে আনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় অনেক কমবে এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে।
স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গত ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের পৃথক চিঠিতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং অন্তত দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের রাজস্ব বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ ব্যয় করবে, আর অসচ্ছল প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে ২০ বছরের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করতে হবে।
দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এখন দ্রুতগতিতে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। জ্বালানিসংকট ও বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপের কারণে ডিবিএল গ্রুপ তাদের ৭টি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে ৫.৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। এছাড়া নতুন করে সিরামিক ও তৈরি পোশাকসহ ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে তারা, যার মধ্যে চলতি বছর ৮ মেগাওয়াট এবং বাকিটা আগামী বছর উৎপাদনে আসবে। ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানান, নতুন প্রযুক্তির কারণে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সময় কম লাগছে এবং কারখানার ছাদের সৌরবিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ছে মাত্র ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপিত হয়েছে, যা দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করছে।
ডিবিএল গ্রুপের মতো বড় শিল্পকারখানাগুলো এখন দ্রুতগতিতে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। গত দশকে সরকারের নীতি ও বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপে পড়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন শুরু হয়। জ্বালানিসংকট প্রকট হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় তিন বছর ধরে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জানান, শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুতের যতগুলো বড় প্ল্যান্ট হয়েছে, তার অধিকাংশই হয়েছে গত দুই বছরে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপিত হয়েছে। তার মধ্যে বেশির ভাগই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে। যদিও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ–শিল্পের বিদ্যুতের পুরো চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তবে কারখানার তিন–চার ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করে। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কারখানার মোট বিদ্যুৎ–চাহিদার ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ হয়। যদিও কারখানাভেদে এই হার বেশিও হয়। ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমাতে পেরেছে এসব শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ—এমনটাই জানান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শিল্পের কর্তাব্যক্তিরা।