প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম (20 September 2026, 12:00 AM)
ক্ষমতার সাত মাস যেতে না যেতেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানামুখী ষড়যন্ত্রের ফাঁদ ও অস্থিতিশীলতার আভাস দেখা দিচ্ছে। একদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো একদফা আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে। এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনে অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক খাতে চক্রান্তের গুঞ্জন সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অশনিসংকেত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার ও বিরোধী দল এখনই সতর্ক না হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে পারে, যার সুযোগ নিতে পারে জুলাই গণ-আন্দোলনের মুখে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে রাজধানীতে একের পর এক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে দলটির উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে এবং পুলিশের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, পরাজিত ও ক্ষমতাচ্যুত শক্তি সবসময় দেশকে অস্থিতিশীল করতে মরিয়া থাকে। তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকে যারা দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে ফেলেছিল, তারাই পুনরায় ফিরে আসার চক্রান্ত করছে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই পরাজিত গোষ্ঠী আরও নানা ধরনের খেলা ও ক্রাইসিস তৈরি করতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। শেখ হাসিনার ফেরার সম্ভাবনা কম হলেও তার পলাতক সহযোগীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। তাই সরকারকে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং বাইরের পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে হবে।
সুশনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের হুমকি এবং বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের ফলে রাজনীতিতে চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। সাড়ে ১৫ বছর ধরে সব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের লোক বসিয়ে আওয়ামী লীগ যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তার কারণে ষড়যন্ত্র থাকবেই। তবে বর্তমানে রাজনীতিতে নৈতিক শক্তির চরম ঘাটতি রয়েছে এবং এটি অনেকাংশেই সুবিধাবাদী রূপ ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগ দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে পারলেও তাদের পুনরায় ফিরে আসার মতো নৈতিক শক্তি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা সব বিষয়কে পশ্চিমা ধাঁচের সরলতায় দেখার চেষ্টা করছেন। ফলে সরকারের ভেতরে-বাইরে কারা প্রকৃত বন্ধু আর কারা ষড়যন্ত্রকারী, তা বুঝতে সময় লাগছে। প্রশাসন, পুলিশ ও পেশাজীবীদের মধ্যে ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি এবং দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষকে আওয়ামী লীগ বা জামায়াতের দোসর বলে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সরকারের একটি সুবিধাবাদী অংশ নিজেদের পছন্দমতো লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
সম্প্রতি দুটি ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করে, যা গোয়েন্দা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ ঘটনার পর গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেন এবং গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে প্রত্যাহার করা হয়। অন্যদিকে, ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানের একটি বিতর্কিত অডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে বলতে শোনা গেছে, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে… চলে আসলে এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’ ওই অডিওতে তিনি সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমালোচনা করার পাশাপাশি ওসি পদায়নে টাকা লেনদেনের অভিযোগও তোলেন।
এছাড়া সম্প্রতি রাজধানীতে বাসে আগুন দেওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার রাজধানীর তিনটি স্থানে বাসে আগুন দেওয়া হয় এবং ওই রাতেই ভারতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় পলাতক শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। একই দিনে রাজধানীর ৭টি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে এবং শনিবারও একাধিক বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে।
অনূকূল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট দেশব্যাপী ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে। সম্প্রতি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চ শেষে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তাদের ৮ দফা দাবি না মানলে তা পরবর্তীতে ‘একদফা’ অর্থাৎ সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়ার মাঝেই সরকারকে এই রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, চলমান ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলা যায় না, এটি একটি বড় সংকেত। অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তা প্রতিহতের চেষ্টা করলেও বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানের মতো উগ্রবাদীদের কারণে দেশে বিপর্যয় নেমে এসেছিল, যার ধারাবাহিকতায় ওয়ান-ইলেভেন আসে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনীতি বন্ধ থাকে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চেয়ে সরকারের ভেতরেই ষড়যন্ত্রকারীরা বেশি সক্রিয় রয়েছে। তাদের যোগসাজশেই গুলশানের মতো জায়গায় আওয়ামী লীগ মিছিল করার দুঃসাহস দেখিয়েছে, যার প্রমাণ ওসির বিতর্কিত অডিও ও বদলি। তিনি সরকারকে সতর্ক থাকার এবং জুলাইয়ের ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ কখনোই মূলধারার রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না, তারা কেবল সমাজে আতঙ্ক ছড়াতে চায়। প্রশাসনের ভেতরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে গভীর নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, চলমান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও আওয়ামী লীগের নাশকতা প্রতিরোধে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। দলটিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের তীব্র নিন্দা জানান। এনসিপির আরেক যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. গোলাম সারোয়ার তুষার বলেন, সরকার মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলেও ছাত্র-জনতা কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন হতে দেবে না।