রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই সংকটের মূল উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও দেশটির ভেতরেই নিহিত। বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: আ রিনিউড কল ফর আ ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের ইভেন্টে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা বৈষম্য ও নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ ও ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটেছিল, যা তৎকালীন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও পরবর্তীতে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার সফলভাবে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সমাধান করেছিল। তবে ২০১৭ সালের সহিংসতার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশ ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির ফলে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিশাল চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
তারেক রহমান জানান, বাংলাদেশ শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা নিজ দেশে পুনঃএকীভূত হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই শিবিরগুলো দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য আদর্শ নয় এবং অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব কেবল বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এছাড়া, মানবিক সহায়তার জীবনরেখা সংকুচিত হয়ে আসা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ হ্রাসের প্রবণতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের আবেদন জানানো হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা শুধু ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাখাইন রাজ্যে এখনো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন যে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। প্রথমত, প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা বন্ধ করে তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি অপরিহার্য। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দিতে হবে। তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে যাওয়ার এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনার বদলে এই সংকটের চূড়ান্ত অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।