বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে ঢেলে সাজাতে এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। 'ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের (এফএসএসপি-২)' আওতায় এই ঋণ দেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন, পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তাবলির মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ডিআইটিএফের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এছাড়া আর্থিক খাতের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা যেমন—সম্পদে অসুলভতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্বল প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিরসনেও প্রকল্পটি কাজ করবে।
পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থাকছে মাত্র ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, আর বাকি বিশাল অংশ ঋণ হিসেবে আসবে বিশ্বব্যাংক থেকে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিসভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে।
দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে উচ্চমাত্রার নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল), সুশাসনের অভাব এবং পুরোনো আইসিটি ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সরকারি ও কিছু বেসরকারি ব্যাংক, যেমন ইসলামী ব্যাংক, তারল্য ও মূলধন সংকটের সম্মুখীন হওয়ায় ঋণাত্মক মূলধনের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সমস্যাগুলো আরও বাড়িয়েছে, যা জিডিপির গতি মন্থর করেছে এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সাইবার আক্রমণ মোকাবিলা এবং আন্তঃসীমান্ত আর্থিক ঝুঁকি নিরসনে আধুনিক আইসিটি অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
প্রকল্পের ব্যয় বিভাজন নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কিছু আপত্তি থাকলেও, এর বড় অংশ ব্যয় হবে প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে। এর মধ্যে আইসিটি সরঞ্জাম কেনায় ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, সফটওয়্যারের জন্য ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং ডেটাবেজ তৈরিতে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীতে আরও এক কোটি পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা আছে। মূলধন খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক সেবায়ও উল্লেখযোগ্য অর্থ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় তিন হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে, যার জন্য বরাদ্দ ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এছাড়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক নিয়োগে মোট ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। প্রকল্পের রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সেমিনার ও সম্মেলনে প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং যানবাহন ব্যবহারে দেড় কোটি টাকা রাখা হয়েছে। তবে নতুন গাড়ি কেনার সুযোগ নেই; প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক পরিবহন নেওয়া যাবে, সেক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্পের ব্যবহারযোগ্য কিছু যন্ত্রপাতি নতুন কর্মসূচিতে স্থানান্তরের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে, তবে অচল বা ব্যবহারের অনুপযোগী সামগ্রী নেওয়া যাবে না।