রাজধানীতে একের পর এক হামলা, ভাঙচুর, জমি দখল ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও অস্বস্তি বাড়ছে। এসব ঘটনার কয়েকটিতে ক্ষমতাসীন বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে সরকার। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার দায় স্বীকার করে সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সরকারের এই বিব্রত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় নেতাদের নাম জড়ানো এবং এ নিয়ে সরকার বিব্রত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে বা কেউ হামলার শিকার হলে সরকার প্রতিটি ঘটনায় দুঃখিত ও বিব্রত। কারণ, নাগরিকদের এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই ছিল। তদন্তে অন্য কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জমি ও বাড়ি দখল এবং ভাঙচুরের ঘটনাগুলো সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুরে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে লুটপাট চালানো হয়। এই ঘটনার নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এর পরপরই শনিবার মধ্যরাতে ইসিবি এলাকায় নিউগিনি প্রোপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা এবং সেখানে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর করা হয়।
এছাড়া গত শনিবার ভোরে আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি বহুতল ভবন দখলের চেষ্টা এবং একই দিন মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে একটি প্লটে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। এই দুটি ঘটনাতেও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ এবং বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এসব ঘটনা সরকারের জন্য বাড়তি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত সোমবার রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালানোর পরও জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে না পাওয়া রহস্যজনক। দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অবশ্য আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির সংসদীয় দল ও দলের অভ্যন্তরীণ একাধিক সভায় তিনি নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে বলেছিলেন, সতর্ক না হলে কারও মুখ দেখা হবে না। গত রোববার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, অপরাধী সে অপরাধীই।
এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে চরম বৈরী পরিস্থিতিতে নানা নির্যাতন সহ্য করে ঐক্যবদ্ধ থাকার পর দল এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। ফলে তাদের দায়িত্বও অনেক বেশি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নেতা-কর্মীদের মধ্যে একধরনের আইন অমান্য করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বড় সমস্যা তৈরি করছে। এসব নেতা-কর্মীকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা ও নিবৃত্ত করা দলেরই দায়িত্ব।