ফুটপাত থেকে মাত্র ৬৫০ টাকায় কেনা একটি শখের চাকু। সেই চাকুটি পেয়ে বন্ধুদের ডেকে ডেকে দেখিয়েছিল ১৬ বছরের এক কিশোর। কিন্তু কে জানত, নিজের জন্মদিনের রাতেই সেই শখের চাকু কেড়ে নেবে এক রিকশাচালকের প্রাণ! গত বুধবার ভোররাতে রাজধানীর দারুসসালামের গাবতলী এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত তিন কিশোরকে গত শনিবার গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগ।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার তিন কিশোরের মধ্যে একজনের বয়স ১৬ বছর পূর্ণ হয়েছে, আর বাকি দুজনের বয়স ১৫ বছরের কম। তাদের কারও পূর্বের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই। একটি জন্মদিনের পার্টি, প্রথমবার মদ্যপান, গভীর রাতে ঘোরাঘুরি, সামান্য বাগ্বিতণ্ডা এবং বন্ধুর উসকানি—কয়েক ঘণ্টার এই ঘটনাপ্রবাহেই একটি হত্যা মামলায় জড়িয়ে গেল এই তিন কিশোরের জীবন।
ডিবি সূত্রের তদন্তে উঠে এসেছে ঘটনার পুরো বিবরণ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ছিল সাদ (ছদ্মনাম) নামের ওই কিশোরের ১৬তম জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে পরিচিত এক বড় ভাই তাকে একটি পার্টিতে ডাকেন। সেখানে সে জীবনে প্রথমবার মদ পান করে। পার্টি শেষে রাত একটার দিকে গাবতলী এলাকায় এসে সাদ তার বন্ধু ফরিদকে (ছদ্মনাম) ফোন করে ডেকে নেয়। দুজনে মিলে গাবতলী এলাকায় ঘোরাঘুরি করার সময় পাশ দিয়ে একটি রিকশা যাওয়ার সময় চালকের আচরণ দেখে তাদের ছিনতাইকারী বলে সন্দেহ হয়। পরে ভুল ভাঙলেও চালকের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয় এবং রিকশাচালক চলে যান।
এরপর রাত তিনটার দিকে তারা আরেক বন্ধু জাহিদকে (ছদ্মনাম) ফোন করে ডেকে আনে। তিন বন্ধু গাবতলীর আল্লাহর দান হোটেলের পাশের একটি চায়ের দোকানে আড্ডায় বসে। সেখানে আগের রিকশাচালকের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার বিষয়টি উঠলে জাহিদ তাকে মারধর করার জন্য বন্ধুদের উসকানি দেয়। এর কিছুক্ষণ পরই তারা ওই রিকশাচালককে আবার দেখতে পায়।
রিকশাচালককে দেখেই সাদ ও জাহিদ আবারও ঝগড়ায় জড়ায়। একপর্যায়ে রিকশাচালক রিকশা থেকে নেমে আল্লাহর দান হোটেলের ভেতরে ঢুকলে কিশোরেরা মনে করে সে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গেছে। এতে তারা আরও ক্ষুব্ধ হয়। কিছুক্ষণ পর রিকশাচালক হোটেল থেকে বের হতেই জাহিদ তাকে একটি থাপ্পড় মারে। এর পরপরই সাদ তার সঙ্গে থাকা ৬৫০ টাকার চাকুটি বের করে রিকশাচালকের ঘাড়ের পেছনে আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় রিকশাচালক রিকশায় উঠে পালানোর চেষ্টা করলেও কিছু দূর গিয়ে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, জড়িত কিশোরেরা পেশাদার অপরাধী নয়। উঠতি বয়সের উত্তেজনা, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও বন্ধুদের উসকানি থেকেই তারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রথমে ফরিদকে যাত্রাবাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়, যে গাবতলীর একটি হোটেলে কাজ করত। পরে তার দেওয়া তথ্যে জাহিদকে ভোলা এবং সাদকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে ঘটনার তিন দিন পর নিহত রিকশাচালকের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাঁর নাম ইমন সর্দার (২৬)। তিনি পাবনা সদর উপজেলার রাধানগর গ্রামের রাশেদুল ইসলাম ওরফে মুন্না সর্দারের ছেলে। ইমন ঢাকায় কখনো রিকশা চালাতেন, আবার কখনো দিনমজুরের কাজ করতেন। পারিবারিক অশান্তির কারণে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কম ছিল। গতকাল রাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন দেশে কিশোর অপরাধ ও সহিংসতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঢাকাতেই ১২৭টি কিশোর গ্যাং শনাক্ত করা হয়েছে। তবে গাবতলীর এই ঘটনায় কোনো গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা মেলেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল এ বিষয়ে বলেন, কিশোর বয়সে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। তাই সন্তান কখন কোথায় যাচ্ছে এবং কার সাথে মিশছে, সে বিষয়ে পরিবারের কঠোর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।