দেশের অন্যতম বৃহৎ গণপরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে এখন গভীর সংকটের মুখে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ট্রেন পরিচালনার মূল শক্তি লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। বর্তমানে রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে মোট ২৭১টি ইঞ্জিন রয়েছে, যার মধ্যে ১৫০টি মিটারগেজ ও ১২১টি ব্রডগেজ। এর মধ্যে ৮৭টি ইঞ্জিনই অকেজো, আর বাকিগুলো জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে চালানো হচ্ছে। এই সীমিত সামর্থ্য দিয়েই বছরে প্রায় ১০ কোটি যাত্রী ও ৪০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে রেলকে।
পাহাড়তলী ডিজেল শপের অধীনে থাকা ৯০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৪০টিই অকেজো এবং বাকি ৫০টি মেরামতের মাধ্যমে সচল রাখা হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সাধারণত ২৫ বছর ধরা হলেও ১৯৫৩, ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে আমদানি করা ২০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো ৭২ বছর পার হওয়ার পরও ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ। একইভাবে ২২০০, ২৬০০ ও ২৭০০ সিরিজের অনেক ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে, তবুও সেগুলো অচল অবস্থায় পড়ে না রেখে জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। এমনকি ১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে আমদানি করা ২৯০০ সিরিজের ৩৯টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯টির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ২০২০ সালে হুন্দাই রোটেম থেকে সরবরাহ করা ৩০০০ সিরিজের ৩০টি আধুনিক লোকোমোটিভ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলেক্ট্রো মোটিভ ডিজেল (ইএমডি)-এর লাইসেন্সে আমদানি করা এই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে পাহাড়তলীর অধীনে থাকা ২২টি ইঞ্জিনের মধ্যে মাত্র ৯টি সচল এবং ১৩টি মেরামতাধীন।
পাহাড়তলী ডিজেল শপের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী এহেতেশাম মো. শফিক জানান, জনবল ও ইঞ্জিন সংকটের কারণে যাত্রীসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, রেলকে পূর্ণ সচল করতে হলে বছরে কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দরকার এবং তা বছরের শুরুতে পাওয়া প্রয়োজন। মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ না থাকায় খুচরা যন্ত্রাংশ সময়মতো সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ বর্তমানে মেরামতের জন্য মাত্র ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যা ছাড় করতেই অর্থবছর শেষ হয়ে যায়।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন জানান, জনবল ও যন্ত্রাংশের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে ৬০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন আমদানির প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও সেগুলো পেতে প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে চীন থেকে ২০টি ইঞ্জিন উপহার হিসেবে পাওয়ার আশা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো ওভারহলিং ও আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে না পারলে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে, যা রেলের রাজস্ব আয় ও যাত্রীসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।