কাগজে-কলমে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার গতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৭০টি উচ্চগতির ইঞ্জিন এবং ৮০০টি যাত্রীবাহী কোচ কিনেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে ভিন্ন রূপ। এসব ইঞ্জিন ও কোচ দিয়ে ৫০ থেকে ৬৭ কিলোমিটারের বেশি গতি তোলা যাচ্ছে না। আবার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেকশনে গতি নেমে এসেছে মাত্র ৫ থেকে ১০ কিলোমিটারে। ২০ থেকে ২৫ বছর আয়ুষ্কালের কথা বলা হলেও কেনাকাটার দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই কেনা ইঞ্জিনের প্রায় অর্ধেক বিকল হয়ে পড়েছে। রেলের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির সিন্ডিকেট এবং সড়ক পরিবহণ খাতের প্রভাবশালী লবির প্রভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন সত্ত্বেও ইঞ্জিন ও কোচের তীব্র সংকট কাটেনি। এর ফলে অন্তত ৭৭টি ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং চলন্ত অবস্থায় ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন বিকল হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে রেলের রোলিংস্টক অর্থাৎ ইঞ্জিন ও কোচ ক্রয়ে খরচ করা হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে রেলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এর চেয়ে প্রায় ১৯ গুণ বেশি বা ৯২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অবকাঠামোর পর্যাপ্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেবল ইঞ্জিন ও কোচের অভাবে নতুন ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ৭টি প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বর্তমানে দৈনিক ৬০টি ট্রেন চলাচল করে। অথচ এই অবকাঠামোতেই দ্বিগুণের বেশি ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। এছাড়া সেখানে আরও অন্তত ১০টি প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের স্থান রয়েছে, যা ব্যবহার করলে দিনে অন্তত ৩০০টি ট্রেন পরিচালনা করা যেত।
সার্বিক বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার রেলখাতের সার্বিক উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ইঞ্জিন ও কোচের সংকটের কারণেই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে নতুন ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেছে। আগামী ২ থেকে ৪ বছরের মধ্যে এই সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তখন নতুন ট্রেন চালুর পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে কেনা ৭০টি ইঞ্জিন ও ৮০০ কোচের পেছনে পাহাড়সম অনিয়মের চিত্র রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের সরবরাহ করা ৩০টি ইঞ্জিনে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত মডেলের অল্টারনেটর ও ট্রাকশন মোটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) ছাড়াই এসব ইঞ্জিন খালাস করে নেওয়া হয়। ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচে আনা এসব ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল ৩০ বছর নির্ধারিত থাকলেও কেনাকাটার মাত্র ২ বছরের মাথায় সেগুলো অচল হতে শুরু করে। বর্তমানে এই ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯টিই অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
অন্যদিকে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ৪০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৩টি ইতোমধ্যেই বিকল। ওজন বেশি হওয়ায় ৩০০০ সিরিজের এসব ইঞ্জিন আখাউড়া-সিলেট রুটে চালানোই সম্ভব হচ্ছে না। রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে, ওই সময়ে কেনা মোট ৭০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৩২টি পুরোপুরি অচল। অবশিষ্ট ৩৮টি ইঞ্জিনও নানা ত্রুটি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। চলন্ত অবস্থায় মাসে গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ বার ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ভৈরব ও আখাউড়াসহ বিভিন্ন সেকশনের ব্রিজে ওঠার সময়েও বিকট শব্দে ইঞ্জিনগুলো বিকল হয়ে পড়ছে।
রেলওয়ে পরিবহণ দপ্তর সূত্র বলছে, সচল ইঞ্জিনগুলোর বেশির ভাগই ৪টির বদলে মাত্র ২টি ট্রাকশন মোটর নিয়ে চলছে। ফলে এসব ইঞ্জিনে পর্যাপ্ত গতি নেই। ১৪০ কিলোমিটার গতি তো দূরের কথা—এর অর্ধেক গতি নিয়ে ট্রেন চললেই লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। কিছু কিছু সেকশনে গতি ৪০-৫০ ওঠাতে গেলেই বিপদে পড়তে হয়। সম্প্রতি জামালপুরগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস এবং তিস্তা এক্সপ্রেস চলন্ত অবস্থায় বিকল হয়ে পড়ে। শুধু এই একটি রুটেই কোনো কোনো মাসে ১৫ থেকে ১৮টি ট্রেন বিকল হওয়ার রেকর্ড তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা হওয়ায় সিলেট রুটে মাত্র ৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুর দুই পাশে ৫ কিলোমিটার এবং পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগের ৪৪৯ কিলোমিটার ট্র্যাকে গতি ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটারে নামিয়ে আনতে হয়। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র সেতু, ঈশ্বরদীর গার্ডার ব্রিজ, পাবনার বাউনজান রেলসেতু, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও তিস্তা রেলসেতু এলাকাতেও নামমাত্র গতিতে চলছে ট্রেন।
রেলের এই চরম অব্যবস্থার পেছনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলা ও তদন্ত পরিচালনা করছে। ইঞ্জিন ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগে রেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুরের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কেনা ৮০০ কোচের মধ্যেও ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০০টি কোচ কেনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা শিথিল করে বিপুল অর্থের ঘুস লেনদেন ও বিদেশে টাকা পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া ২০২০ সালে কোনো প্রাক-সমীক্ষা ছাড়াই ২৫৮ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করে ১২৫টি লাগেজভ্যান কেনার অভিযোগে সাবেক ডিজি শামসুজ্জামানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাত্মেল হক চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, রেল এখন দুর্নীতি ও লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রেলের কর্মকর্তাদের একাংশ সড়ক ও আকাশপথের ব্যবসায়ী মালিকদের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনে জড়িত। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে অন্তত ৩০টি ট্রেন চালানো সম্ভব হলেও সেখানে চলছে মাত্র ২টি ট্রেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের বিপণন ও করপোরেট পরিকল্পনা দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, প্রভাবশালী সড়ক পরিবহণ লবি কখনোই চায় না রেল লাভজনক হোক, কারণ রেলে সুবিধা বাড়লে বাস ও বিমান ব্যবসায় ধস নামবে। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও শক্তিশালী পরিবহণ লবির চক্রান্তেই রেল লোকসানে চলছে। জনস্বার্থে অবিলম্বে এখানে কোচ ও ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়িয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। বুয়েটের অধ্যাপক ড. এম সামছুল হক বলেন, চড়াদামে কেনা ইঞ্জিন-কোচ মান্ধাতা আমলের নিয়মে চালানো হচ্ছে এবং অনিয়মের প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট না ভাঙলে এই কঙ্কালসার অবস্থা দূর হবে না।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন জানান, নতুন ইঞ্জিন ও কোচ বহরে যুক্ত হলেই বন্ধ ট্রেনগুলো চালু করা হবে। ফকির মো. মহিউদ্দিন উল্লেখ করেন, বর্তমানে রেলে মাত্র ২৭০টি ইঞ্জিন রয়েছে, তবে ভারত থেকে কোচ আসছে এবং নতুন আরও ৩০টি ইঞ্জিন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ে প্রস্তুত রয়েছে এবং সময়মতো ইঞ্জিন ও কোচ পাওয়া গেলে বিদ্যমান সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সরকার রেল উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইঞ্জিন-কোচ সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন ক্রয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। আগামী ২-৪ বছরের মধ্যে সংকট নিরসন হবে। আমরা আরও নতুন ট্রেন চালাতে পারব। যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
বর্তমানে এর ১৯টিই পড়ে আছে অকেজো হয়ে। অন্যদিকে ২০২১-২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ৪০টি ইঞ্জিনের ১৩টিই বিকল। আখাউড়া-সিলেট রুটে ওজন বেশি হওয়ায় ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো চালানোই যাচ্ছে না। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ওই সময় কেনা মোট ৭০টি নতুন ইঞ্জিনের মধ্যে ৩২টি বিকল। বাকি ৩৮টি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। চলন্ত অবস্থায় মাসে গড়ে ৬০-৬৫ বার ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে। ভৈরব, আখাউড়াসহ বিভিন্ন সেকশনে ব্রিজে ওঠার সময় ইঞ্জিনগুলো চলন্ত অবস্থায় বিকট শব্দে বিকল হয়ে পড়ছে।