কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার করা ৫৬ জিম্মিকে টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করেছে যৌথবাহিনী। শুক্রবার সকালে তাদের থানায় এনে পরিচয় ও তথ্যাদি যাচাই-বাছাই শুরু করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে হ্নীলা ইউনিয়নের ওই পাহাড়ে অভিযান চালানোর সময় পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথবাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে সশস্ত্র পাচারকারীদের গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন (রামু ক্যান্টনমেন্ট), বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী বৃহস্পতিবার এই অভিযান পরিচালনা করে। উদ্ধার অভিযানের সময় মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
থানা হেফাজতে থাকা ভুক্তভোগীদের বর্ণনা থেকে মানব পাচারচক্রের নির্মম কর্মকাণ্ডের চিত্র উঠে এসেছে। ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানান, কক্সবাজারের একটি সেতুতে কাজের সূত্রে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়ে মোবাইলসহ সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হয়। গভীর রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পাহাড়ে নিয়ে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাকে। আসাদুজ্জামান জানান, সেখানে তাকে টানা আট দিন ঝুপড়ি ঘরে বন্দি রাখা হয়। পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল এবং তার মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন।
উখিয়ার বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর জানান, নূর আলী নামে এক দালাল ভালো কাজের আশ্বাস দিয়ে তাদের পাচারকারীদের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয়। পাহাড়ে প্রতিদিন নতুন চার-পাঁচজনকে ধরে এনে জমা করা হতো। প্রতিবাদ বা পালানোর চেষ্টা করলে তাদের ওপর চালানো হতো তীব্র নির্যাতন এবং লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হতো। বন্দিদের দিনে মাত্র দুবেলা কাঁচা লাউ ও ডাল খেতে দেওয়া হতো। বৃহস্পতিবার ট্রলারে করে তাদের বঙ্গোপসাগর দিয়ে পাচারের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তার আগেই যৌথবাহিনী তাদের উদ্ধার করে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনের তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি পাহাড়ে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া ও লেদা ক্যাম্পের নিকটবর্তী একটি পাহাড়ি ঝিরিতে অজ্ঞাত তিনজনের লাশ পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। লাশগুলো উদ্ধারে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে এবং দুর্গম এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পর টেকনাফজুড়ে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ছাত্র প্রতিনিধিরা বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করে পাহাড়ে পাচারকারীদের আস্তানা গুটিয়ে দিতে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন। হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী ও স্থানীয় অধিবাসী নুর আলম বলেন, শীত মৌসুমে বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে অস্ত্রধারীদের অপতৎপরতা বেড়ে যায়। প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। পাহাড়ি এসব সিন্ডিকেট পুরোপুরি নির্মূল করতে ধারাবাহিক ও একযোগে সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনীক চৌধুরী সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন, পাহাড়ে অবস্থানরত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে রয়েছে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং এই সংকট মোকাবিলায় স্থানীয়দেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।