প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক একটি গল্প, যা মানুষের জীবনযাত্রার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান প্রকৃতির এই বিবর্তন ও গল্পগুলো খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করা ড. খান ১৯৮৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল আইন চিড়িয়াখানায় এবং ১৯৮৯ সালে দুবাই চিড়িয়াখানার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে বন্য প্রাণীদের লাল তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
ড. রেজা খান পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঘাইছড়ি ও লংগদু এলাকার 'বাদি হাঁস'-এর উদাহরণ দিয়ে জানান, এটি দেশের একমাত্র হাঁস যা সারা বছর বনে থাকে এবং গাছের কোটরে বাসা বাঁধে। ১৯৭৭ সালে তিনি যখন পাবলাখালী যান, তখন বন উজাড়ের ফলে হাঁসগুলো তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সিভিটগাছ হারিয়ে শিমুল বা ছাতিমগাছে বাসা বাঁধতে বাধ্য হয়। স্থানীয় মানুষ একসময় হাঁসের ডিম ফুটানোর শব্দ শুনে তা সংগ্রহ করে নিজেদের হাঁসের সাথে বড় করত। কিন্তু বন উজাড় ও দেশলাই তৈরির শিল্পের কারণে সেই জীবিকা ও হাঁসের সাথে মানুষের সহাবস্থানের গল্পটি এখন হারিয়ে গেছে।
বনের আদিবাসীদের কাছ থেকে শেখা অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি ১৯৭৯ সালের টেকনাফ ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করেন। সেখানে এক 'পালোয়ান'-এর কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে বাতাসের দিক বুঝে হাতির উপস্থিতি থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। ড. খানের মতে, বর্তমানে প্রকৃতির প্রতি মমতা কমে গেছে। মানুষ প্রকৃতিকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে দেখছে, কিন্তু শিশুদের প্রকৃতির শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। তিনি পরামর্শ দেন, স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে চাষাবাদ ও বৃক্ষরোপণ শেখানো হলে তবেই তাদের মধ্যে মাটির প্রতি মমতা তৈরি হবে।
ড. খান তাঁর নিজ গ্রাম ধামরাইয়ের বালিয়া গ্রামের উদাহরণ টেনে বলেন, নদী-খাল শুকিয়ে যাওয়ায় জেলে, কৃষক ও মাঝিদের মতো অনেক পেশা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গ্রামের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ৮০ শতাংশই এখন হারিয়ে গেছে। বন কাটার ফলে মাটির নিচের ছত্রাকের বিশাল জাল নষ্ট হয়ে যায়, যা বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে সাহায্য করত। এখন ঝরনার পানি কমে যাওয়ায় পাহাড়ের মানুষ সংকটে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, মানুষের বিপদে অন্য মানুষ পাশে দাঁড়ালেও বন্য প্রাণীর সেই সুযোগ নেই। অধিক ফলনের জন্য অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার ব্যাঙ, টিকটিকি ও কেঁচোর মতো মাটির উর্বরতা রক্ষাকারী প্রাণীদের বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ১৯৮৩ সালের তুলনায় দেশের বন ও বন্য প্রাণীর প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই হারিয়ে গেছে বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, মাটি রক্ষা করতে হলে নদী ও বন সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই এবং সরকারকে এখনই খালি জমিতে বড় বড় দিঘি কেটে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।