গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মধ্যে আওয়ামী প্রচারবিদরা রক্তাক্ত এই জুলাইয়ের অর্জনকে অস্বীকার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের বাম রাজনৈতিক মিত্ররা। তারা প্রশ্ন তুলছে—‘হাসিনাকে তাড়িয়ে বাংলাদেশ কী পেল?’ যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো, দেড় সহস্রাধিক মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বিপ্লবকে একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা। মূলত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনার আড়ালে তারা হাসিনার আমলের গুম, খুন ও নিপীড়নের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চাইছে।
হাজারো মানুষের আত্মদানের বিনিময়ে বাংলাদেশ আজ কথা বলার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের তথ্যমতে, এই অভ্যুত্থানে ৯৮৬টি রেকর্ডকৃত মৃত্যুর মধ্যে ১১৮ জন শিশু এবং অন্তত ১৩ জন নারী শহীদ হয়েছেন। নাফিসা ও আনাসের মতো অগণিত কিশোর-তরুণ তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এদেশের মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করেছে। ৫ আগস্ট সাভারে গুলিবিদ্ধ নাফিসা তার বাবাকে বলেছিল, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত সে বাড়ি ফিরবে না। আর আনাস তার চিঠিতে লিখেছিল, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সে রাজপথে নেমেছে। অথচ আজ নাফিসা-আনাসদের সেই আত্মত্যাগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। নাফিসা-আনাসদের রক্তের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের অর্জনগুলো আজ ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনের পর নির্বাচিত সরকারের আরও পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো মানুষ গুম হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। সরকারের মন্ত্রীদের সমা… (২৩ জন মন্ত্রীর সমন্বয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভা ৭ মাস ধরে কাজ করছে)। হাসিনা ও তার বাবার সমালোচনার দায়ে অতীতে বহু মানুষকে জেল খাটতে হয়েছে, এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১,৩০০টি মামলা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশের বামপন্থি সংগঠনগুলো বছরের পর বছর ধরে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু বামপন্থিরা এই অর্জনকে খাটো করে বিরোধী দলকে জাতীয় পার্টির সঙ্গে তুলনা করছে, যেন তারা আওয়ামী লীগের সেই পুরোনো বয়ানই ফেরি করছে।
হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ভারতের আধিপত্যবাদের নিগড়ে বন্দী ছিল, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর দেশটি তার আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের সুযোগ পেয়েছে। তথাকথিত বামপন্থিরা, যারা ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করেছে, তারা এখন আবার সক্রিয়। অতীতে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের ওপর হাসিনার নির্যাতনের সময় যারা তোপখানা রোডে নামমাত্র কর্মসূচি দিয়েছে, তারাই এখন গণতন্ত্রের দোহাই দিচ্ছে। নির্বাচনগুলোতে জামানত হারানো এই বামপন্থিরা আসলে ইসলামোফোবিয়া থেকে তাদের রাজনীতি পরিচালনা করে এবং শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগেরই সহযোগী হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে, এবারের গণঅভ্যুত্থান শুধু আওয়ামী লীগকেই নয়, বরং তাদের টিকিয়ে রাখার যাবতীয় ন্যারেটিভকেও পরাজিত করেছে। বামপন্থিরা নিজেদের সংশোধন না করে এখনো আওয়ামী লীগের পুরোনো জুতো পায়ে দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করছে, যা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রমাণ করে।