হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত বেড়ে ৭৮৬; সতর্ক থাকার আহ্বান

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৬ জনে। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো হামের টিকা গ্রহণ করেনি অথবা নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করেনি, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালে জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে।
আরও তিন শিশুর মৃত্যু
সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও প্রতিটি মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে চিকিৎসকরা বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবুও প্রাথমিকভাবে হামের জটিলতাকেই মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে আক্রান্ত অধিকাংশ শিশু যথাযথ চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিংবা চিকিৎসা নিতে দেরি হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। এসব জটিলতার কারণেই মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৬
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট শনাক্ত হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৬ জনে। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু হলেও কিছু কিশোর-কিশোরী এবং প্রাপ্তবয়স্কও রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব এলাকায় টিকাদানের হার তুলনামূলক কম, সেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে।
কীভাবে ছড়ায় হাম?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। একই কক্ষে অবস্থান করা কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে সহজেই অন্যরা সংক্রমিত হতে পারে।
সংক্রমিত ব্যক্তির শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই ভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়াতে শুরু করে এবং ফুসকুড়ি ওঠার পরও কয়েক দিন পর্যন্ত সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
হামের সাধারণ উপসর্গ
হামের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। প্রধান উপসর্গগুলো হলো—
- উচ্চমাত্রার জ্বর
- শুকনো কাশি
- নাক দিয়ে পানি পড়া
- চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়া
- মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (কপলিক স্পট)
- মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়া
- দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা
এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
চিকিৎসকদের মতে, নিচের ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন—
- পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু
- যারা এখনো হাম প্রতিরোধী টিকা নেয়নি
- অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
- গর্ভবতী নারী
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি
স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কবার্তা
স্বাস্থ্য বিভাগ জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের শিশুদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টিকাদানই হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। যেসব এলাকায় টিকাদানের হার বাড়ানো সম্ভব হয়েছে, সেখানে সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম।
কী করবেন?
হামের উপসর্গ দেখা দিলে—
- দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখুন।
- পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার দিন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করবেন না।
- শিশুর জ্বর ও শ্বাসকষ্ট বাড়লে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।
প্রতিরোধে করণীয়
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন—
- নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ।
- কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা।
- নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।
- আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।
- ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা।
- শিশু অসুস্থ হলে বিদ্যালয় বা জনসমাগমে না পাঠানো।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামকে সাধারণ রোগ হিসেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। উন্নত চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভুল তথ্য বা গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। সময়মতো টিকা গ্রহণের মাধ্যমে শুধু একজন শিশুই নয়, পুরো সমাজকে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
উপসংহার
দেশে হামের সংক্রমণ এবং শিশু মৃত্যুর সাম্প্রতিক ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বার্তা বহন করছে। আক্রান্তের সংখ্যা ৭৮৬-এ পৌঁছানো এবং আরও তিন শিশুর মৃত্যুর খবর পরিস্থিতির গুরুত্বকে স্পষ্ট করে তুলেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্ক নয়—সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা এবং শতভাগ টিকাদানই এই রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
অভিভাবকদের উচিত শিশুদের নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করা, উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে হামের বিস্তার রোধ করা এবং শিশুদের নিরাপদ রাখা সম্ভব।