মানব জীবনের প্রকৃত সম্পদ হলো মানুষের নেক আমল বা সৎকর্ম। দুনিয়ার মোহ এবং ধন-সম্পদ মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে যায় না, কারণ কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকে না। ধনী বা দরিদ্র, রাজা বা ফকির—মৃত্যুর পর সবাইকে কয়েক মিটার সাদা কাপড়ে জড়িয়েই বিদায় নিতে হয়। তবুও মানুষ দুনিয়ার মায়ার মোহে অন্ধ হয়ে সম্পদের পেছনে ছুটে চলে।
বিষয়টি একটি গল্পের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এক ব্যক্তির তিনজন বন্ধু ছিল। সে প্রথম বন্ধুকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসত এবং তার জন্য সবকিছু উৎসর্গ করত। দ্বিতীয় বন্ধুটিকেও সে পছন্দ করত, কিন্তু প্রথমজনের মতো নয়। আর তৃতীয় বন্ধুটির সাথে সে খুব একটা সময় কাটাত না এবং তাকে অবহেলা করত। হঠাৎ একদিন রাজার পক্ষ থেকে সেই ব্যক্তির কাছে একটি পরোয়ানা এলো যে, তাকে এক অত্যন্ত দীর্ঘ ও কঠিন সফরে যেতে হবে এবং সেখানে তার বিচার হবে।
একাকী এই কঠিন সফরে যেতে ভয় পেয়ে লোকটি তার বন্ধুদের সাহায্য চাইল। সে প্রথমেই তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর কাছে গিয়ে সফরের সঙ্গী হতে অনুরোধ করল। বন্ধুটি নির্দ্বিধায় জানিয়ে দিল, সে বড়জোর তাকে কিছু নতুন পোশাক বা কাফন দিতে পারবে, কিন্তু এক কদমও সঙ্গে যেতে পারবে না। এরপর সে দ্বিতীয় বন্ধুর কাছে গেল। সে জানাল, সে বড়জোর সফরের সীমানা বা কবর পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দিতে পারবে, এরপর তাকে ফিরে আসতে হবে কারণ তার নিজের অনেক কাজ রয়েছে।
সবশেষে, অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে লোকটি তার তৃতীয় অবহেলিত বন্ধুর কাছে গেল। বন্ধুটি তাকে দেখা মাত্রই জড়িয়ে ধরে আশ্বস্ত করল যে, সে যেখানেই যাবে, সে তার সাথে থাকবে। বিচারকের সামনে সে তার পক্ষে কথা বলবে এবং কবরের অন্ধকার নির্জনতায় সে তার আলো হয়ে পাশে থাকবে।
এই গল্পের বন্ধুদের রূপক অর্থ হলো: প্রথম বন্ধু হলো মানুষের ধন-সম্পদ, যা মৃত্যুর পর কাফন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। দ্বিতীয় বন্ধু হলো আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব, যারা বড়জোর কবর পর্যন্ত সঙ্গ দেয়। আর তৃতীয় বন্ধু হলো মানুষের নেক আমল, যাকে আমরা দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি, অথচ কবরের নির্জনতায় কেবল সে-ই আমাদের প্রকৃত সাথী হয়। ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.)-এর বুস্তানুল ওয়ায়িযীন গ্রন্থ অনুযায়ী, আমাদের উচিত সেই তৃতীয় বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব মজবুত করা, কারণ চূড়ান্ত বিপদে কেবল সে-ই পাশে দাঁড়ায়।