ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধের হুমকি দিয়েছে। এমন এক সময়ে এই হুমকি এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজার ইতিমধ্যেই বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে রয়েছে। ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পর হুতিদের এই নতুন হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও হুতিরা এখনো তাদের ঘোষিত অবরোধ কার্যকর করতে পারেনি, তবুও তাদের এই হুমকির কারণে বেশ কিছু জাহাজ লোহিত সাগর ছেড়ে দক্ষিণমুখী যাত্রা বাতিল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা কার্যকরভাবে এই প্রণালি অবরোধ করতে সক্ষম হলে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতে একটি নতুন যুদ্ধফ্রন্ট তৈরি হতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন ফ্রন্টে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হতে পারে, যা একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার মার্কিন সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এছাড়া এই হুমকির ফলে ইউরোপে সৌদি আরবের ডিজেল রপ্তানিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চলতি মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের বেশি বেড়েছে। গত ২২ জুলাই বুধবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ৯৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা জুনের শুরু থেকে সর্বোচ্চ। তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬২ লাখ ব্যারেল তেল বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালির চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ সংকীর্ণ এই সমুদ্রপথটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
সৌদি আরব বর্তমানে যুদ্ধের কারণে তাদের বিশাল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাচ্ছে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট জানান, সৌদি প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই বিকল্প পথে সরিয়ে নিচ্ছে। যদি এই পথটিও অচল হয়ে যায়, তবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ সংকট চরম আকার ধারণ করবে। পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিংয়ের মতে, বাব আল-মান্দেব পুরোপুরি অবরুদ্ধ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আরও ৫ থেকে ১০ ডলার বেড়ে সহজেই ১০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপোভের তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল ইয়ানবু বন্দর থেকে বাব আল-মান্দেব হয়ে রপ্তানি করা হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এই সরবরাহ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহি জানান, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি শোধনাগারগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল ডিজেল সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে যায়, যা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
গত মঙ্গলবার হুতিরা সৌদি জাহাজগুলোর উদ্দেশে বেতার বার্তায় লোহিত সাগর এড়িয়ে চলার সতর্কতা জারি করে। উইন্ডওয়ার্ড ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘোষণার পর অন্তত পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে। এছাড়া ইয়ানবু বন্দর থেকে চীনের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি তেলবাহী ট্যাংকারও হুতিদের হুমকির মুখে ফিরে আসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিরা বড় কোনো পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সচল রাখতে ব্যস্ত রয়েছে। জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের পর হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় প্রণালিতেই নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।