পৃথিবীতে মানুষের ব্যবহৃত প্রথম অস্ত্রের সন্ধানে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এমন কিছু নমুনা খুঁজে পেয়েছেন, যার একটির বয়স চার লাখ বছরের বেশি। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক বেন ফিটজহিউয়ের মতে, অন্য কোনো জীবের ওপর আঘাত বা সহিংসতা চালানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত যেকোনো বস্তুই অস্ত্র। এর মধ্যে যেমন শিকারের সরঞ্জাম আছে, তেমনি মানুষে-মানুষে সংঘর্ষে ব্যবহৃত বস্তুগুলোকেও ধরা হয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা কোনো বস্তুকে অস্ত্র হিসেবে নিশ্চিত করার আগে এর পেছনের উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের প্রমাণ খোঁজেন। স্টকহোম ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্ববিদ রলফ ওয়ার্মিং জানান, গবেষকেরা সাধারণত খননস্থলে শিকারের চিহ্ন বা অস্ত্র তৈরির সূক্ষ্ম সরঞ্জামের অস্তিত্ব এবং বস্তুর গায়ে ব্যবহারের ক্ষয়চিহ্ন পরীক্ষা করেন।
ওয়ার্মিংয়ের মতে, বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ডে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন অস্ত্রের দাবিদার হিসেবে তিনটি আবিষ্কার সবচেয়ে বেশি আলোচিত—ক্ল্যাকটন বর্শা, শ্যোনিঙেনের বর্শা ও নিক্ষেপণ লাঠি এবং কাথু প্যান–১ বর্শাফলক। এর মধ্যে ক্ল্যাকটন বর্শার বয়স চার লাখ বছরের বেশি বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। ১৯১১ সালে ইংল্যান্ডের এসেক্সের ক্ল্যাকটন-অন-সি এলাকা থেকে উদ্ধার করা ১৫ ইঞ্চি লম্বা এই কাঠের অংশটি মূলত একটি বড় বর্শার অগ্রভাগ। এটি ইউ (Yew) গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি এবং এর এক প্রান্ত ঘষে অত্যন্ত ধারালো করা হয়েছিল। বর্তমানে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত এই বর্শাটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সংরক্ষিত কাঠের বর্শার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি হোমো হাইডেলবার্গেনসিস অথবা নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির মানুষের তৈরি এবং এটি মূলত কাছ থেকে বড় প্রাণীর ওপর আঘাত করার জন্য ব্যবহৃত হতো।
দ্বিতীয়ত, ১৯৯২ সাল থেকে জার্মানির শ্যোনিঙেন শহরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি কাঠের অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যার বয়স দুই থেকে তিন লাখ বছরের মধ্যে। শ্যোনিঙেন রিসার্চ মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সম্পূর্ণ অক্ষত কাঠের তৈরি অস্ত্র। এগুলো দিয়ে ঘোড়ার মতো বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করা হতো এবং এগুলো প্রয়োজনে কাছ থেকে আঘাত বা দূর থেকে নিক্ষেপ করা যেত। এর মধ্যে ২৬ ইঞ্চি লম্বা ছোট লাঠিগুলো ছিল প্রজেক্টাইল অস্ত্র। মজার বিষয় হলো, বর্শার মাথা আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়েছিল, যা আদিম মানুষের উন্নত শিকার কৌশলের প্রমাণ দেয়।
তৃতীয়ত, দক্ষিণ আফ্রিকার কাথু প্যান প্রত্নস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কিছু পাথরের ফলকের বয়স প্রায় পাঁচ লাখ বছর। এগুলোর নিচের অংশের আকৃতি বর্শার মাথায় বসানোর উপযোগী এবং ধার বরাবর ব্যবহারের বিশেষ ক্ষয়চিহ্ন রয়েছে। যেহেতু এগুলোর বয়স হোমো সেপিয়েন্সের চেয়েও বেশি, তাই ধারণা করা হয় এগুলো হোমো হাইডেলবার্গেনসিসদের তৈরি। সম্ভবত ওত পেতে শিকার করার কাজে এগুলো ব্যবহার করা হতো। তবে কাঠের হাতল না পাওয়ায় কিছু গবেষক এগুলোকে নিশ্চিতভাবে বর্শার ফলক না বলে সাধারণ পাথরের হাতিয়ার হিসেবেই বিবেচনা করেন।
আদিম মানুষেরা অস্ত্র তৈরিতে কাঠ, পশুর রগ, উদ্ভিদের আঁশ এবং প্রাকৃতিক আঠার মতো জৈব উপাদান ব্যবহার করত, যা সময়ের সঙ্গে পচে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে আরও প্রাচীন অস্ত্র থাকলেও সেগুলোর প্রমাণ পাওয়া কঠিন। রলফ ওয়ার্মিংয়ের মতে, বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে ক্ল্যাকটন বর্শাই সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন নিশ্চিত অস্ত্র। এসব আবিষ্কার কেবল হিংস্রতার প্রতীক নয়, বরং আমাদের পূর্বপুরুষদের বুদ্ধিমত্তা, কল্পনাশক্তি ও দলবদ্ধভাবে কাজ করার দক্ষতার সাক্ষী বহন করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে ৬.৬ ফুটেরও বেশি লম্বা বর্শাগুলো ঘোড়ার মতো বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকারে ব্যবহৃত হতো। প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলো কাছ থেকে আঘাত করতে, আবার দূর থেকে ছুড়েও ব্যবহার করা যেত। অন্যদিকে প্রায় ২৬ ইঞ্চি লম্বা ছোট লাঠিগুলো ছিল একধরনের প্রজেক্টাইল অস্ত্র, যা দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করা হতো।