সরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালনায় ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে অবশেষে ইজারার দিকেই ঝুঁকছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। গত দুই অর্থবছরে রেলওয়ে গড়ে প্রায় পৌনে তিন হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন করে ১৭ জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ১৩ জোড়া ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চললেও, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে মোট ৩০ জোড়া ট্রেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে। রেলওয়ের দাবি, ইজারার মাধ্যমে ৬০টি ট্রেন পরিচালনায় বছরে প্রায় শতকোটি টাকা আয় করা সম্ভব হবে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম জানিয়েছেন, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জনবল স্বল্পতা ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে কম দূরত্বের ট্রেনগুলো সরকারিভাবে চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে ১১ জোড়া এবং পূর্বাঞ্চলে ৬ জোড়া ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
তবে এই উদ্যোগের ফলে ভাড়া বৃদ্ধি ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কা রয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনগুলোতে টিকিট ফাঁকির প্রবণতা অনেক বেশি, যেখানে ৯০ শতাংশের বেশি যাত্রী টিকিট ছাড়াই ভ্রমণ করেন। ইজারার ক্ষেত্রে প্রতিটি ট্রেনের জন্য ৪০ দিন আগে নির্ধারিত অর্থ জমা দিতে হয় এবং সমপরিমাণ অর্থ জামানত হিসেবে রাখতে হয়। পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৩ জোড়া ট্রেনের বার্ষিক আয় যেখানে ২১ কোটি ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৭০৪ টাকা, সেখানে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় একই সংখ্যক ট্রেনের আয় ৫৮ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার ২৬ টাকা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির প্রশ্ন তুলেছেন, একই কোচ ও যাত্রী নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করতে পারলে রেলওয়ে কেন পারছে না। রেলওয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ৭০টি যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রয়েছে এবং সেগুলো মেরামত করে ইজারার পরিকল্পনা রয়েছে। বুয়েটের অধ্যাপক ড. এম সামছুল হক এই উদ্যোগের সমালোচনা করে বলেন, ট্রেন ইজারা দেওয়া রেলের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তার মতে, মালামাল পরিবহন বৃদ্ধি এবং বেদখলে থাকা রেলের জমি উদ্ধারের মাধ্যমেই রেলকে লাভজনক করা সম্ভব।