র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত না করে বরং নাম পরিবর্তন করে বাহিনীটিকে বহাল রাখার পরিকল্পনা করছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ লক্ষ্যে একটি নতুন আইনের খসড়া তৈরির কাজ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন এই আইনের মাধ্যমে বাহিনীটির নাম বদলে স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (এসআরএফ) অথবা স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে ২০০৩ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে র্যাব গঠিত হয়েছিল। নতুন দুটি নামের মধ্যে যেকোনো একটি চূড়ান্ত হতে পারে।
নতুন আইনের খসড়া নিয়ে গত রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, র্যাবকে কেবল নামমাত্র পুলিশের অধীনে না রেখে বরং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া র্যাবের কার্যক্রমের এলাকা কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে র্যাব সারা দেশে কাজ করলেও, ভবিষ্যতে তা কেবল মহানগর এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় কি না, তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। তবে মহানগর এলাকায় পুলিশের বাড়তি জনবল ও আলাদা ইউনিট থাকা সত্ত্বেও র্যাবের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বরং মনে করেন, জেলা পর্যায়ে পুলিশের জনবল ঘাটতি থাকায় সেখানে র্যাবের কার্যক্রম বিস্তৃত করা বেশি জরুরি।
খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী ২৯ জুলাই সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরেকটি সভা করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যেখানে সবার মতামত নিয়ে আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হতে পারে। খসড়ায় মোট ৯টি অধ্যায় ও ২৯টি ধারা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ইউনিটের গঠন, দায়িত্ব, তল্লাশি ও গ্রেপ্তার, ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত, সদস্যদের শাস্তি, প্রশিক্ষণ এবং পুরোনো র্যাবের সম্পদ ও সদস্য স্থানান্তরের বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো কার্যকর হলে র্যাব নামটি বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির সদস্য, স্থাপনা, অস্ত্র, সরঞ্জাম, মামলা ও দায়দেনা নতুন ইউনিটের অধীনে চলে যাবে। তাই একে র্যাবের বিলুপ্তি নয়, বরং নাম বদলে পুনর্গঠন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল। এছাড়া বিএনপিও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বাহিনীটি বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিল। নতুন খসড়া অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ইউনিটটি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। এর মহাপরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে সরকার নিয়োগ দেবে। মহাপরিচালক পুলিশ মহাপরিদর্শকের নিয়ন্ত্রণ ও আদেশ মেনে ইউনিট পরিচালনা করবেন।
খসড়ায় আগের মতোই সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সদস্য নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান মনে করেন, শুধু নাম বা পোশাক পরিবর্তন করলেই র্যাবের সংস্কার হবে না। তিনি বাহিনীর ক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন। নূর খানের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব, তাই এখানে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের রাখা উচিত নয়। সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যরা নিয়মিত আইন প্রয়োগে যুক্ত থাকলে বলপ্রয়োগ ও নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাবিত ইউনিটের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও সাইবার অপরাধ দমন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নির্মূল। খসড়ায় পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রাখা হয়েছে। এছাড়া নতুন বিধান কার্যকর হলে এই ইউনিট নির্দিষ্ট কিছু মামলায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সংস্থার ভূমিকা পালন করবে। সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব থাকলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে কারণ কমিটির অধিকাংশ সদস্যই সরকারি কর্মকর্তা।