একটি দেশের মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা। সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ্যসূচিতে যে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা একটি দক্ষ ও সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় বন্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি কারিকুলামে যে সংশোধনী আনা হচ্ছে, তা শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে অত্যন্ত জরুরি। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে। এই ব্যাধি দূর করতে কেবল পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি নয়, বরং শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন। নতুন সংস্কারে প্রশ্নপত্রের কাঠামো এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যেখানে মুখস্থ নির্ভরতা দিয়ে পার পাওয়া সম্ভব হবে না। মূল্যায়ন পদ্ধতি যখন সৃজনশীল মেধা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে হবে, তখন নকল করার সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা দুই-ই কমে আসবে।
বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের পাঠ্যক্রমকে জীবনমুখী ও দক্ষতানির্ভর করা আবশ্যক। আগের কারিকুলামে তাত্ত্বিক জ্ঞানের আধিক্য থাকলেও ব্যবহারিক প্রয়োগের অভাব ছিল। সংশোধিত কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে বইয়ের বোঝা কমিয়ে তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা কেন শিখছে এবং কীভাবে তা জীবনে প্রয়োগ করবে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেবল বছরের শেষে একটি বড় পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে সারা বছরের ধারাবাহিক মূল্যায়নকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যা পরীক্ষার ভীতি ও চাপ অনেকাংশেই কমিয়ে দেবে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পথও প্রশস্ত করা হচ্ছে এতে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভিভাবকরা। সন্তানের সাফল্য তাদের স্বপ্ন হলেও অনেক সময় তারা অজান্তেই সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করেন। ভালো ফল অর্জনের জন্য নিরন্তর তাগিদ, অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা কিংবা নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং পরীক্ষাভীতিতে ভোগে। তবে এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং কেবল ভালো ফল নয়, বরং সৎ প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন এবং একটি সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করেন, তবে শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে এবং সন্তানের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতাকে সম্মান জানিয়ে উৎসাহ দিতে হবে, চাপ নয়।
যেকোনো বড় পরিবর্তনেই কিছু প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ থাকে। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের শিক্ষার মানের বৈষম্য দূর করতে প্রযুক্তির সুষম বণ্টন প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা রাখবে। জিপিএ-৫ এর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে সন্তান কতটা শিখল, সেই বিচারে তাদের উৎসাহিত করতে হবে। এই সংস্কার কেবল সময়ের দাবিই নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি। পরীক্ষায় নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়নের মাধ্যমে এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যারা কেবল সনদধারী হবে না বরং দেশপ্রেম ও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতায় বলীয়ান হবে। এই ইতিবাচক উদ্যোগ সফল করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
অন্য দিকে, মাধ্যমিক পরবর্তী কলেজ ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়েও অভিভাবকদের কিছু অভিযোগ রয়েছে। ভর্তি নীতিমালা জটিল হওয়ায় অনেক সময় তারা সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কোন কলেজে আবেদন করলে বেশি সুযোগ থাকবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকেই ভুল পছন্দক্রম দিয়ে ফেলেন। পাশাপাশি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগও উঠে আসে, যা সাধারণ পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট সুবিধার অভাব এবং সঠিক দিকনির্দেশনার ঘাটতির কারণে আবেদন প্রক্রিয়াতেই পিছিয়ে পড়ে। ফলে মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হারায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি, অন্যথায় প্রতি বছরই এসএসসি-পরবর্তী ভর্তি নিয়ে এই বিড়ম্বনা চলতেই থাকবে।