বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বর্তমান ও সাবেক ১৭ জন নেতাকে গত জুন ও জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই নেতারা এখনো তাঁদের দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেননি। অথচ এসব নিয়োগের শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক থাকলে তা যোগদানের আগেই পরিত্যাগ করতে হবে।
বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এ বিষয়ে বলেন, তিনি মৌখিকভাবে দপ্তরে জানিয়েছেন যে তিনি পদে থাকবেন না। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এটিকে কেবল ‘আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, ‘১৮ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, জেল খেটেছি। এসব কেউ শোধ করতে পারবে?’
একইভাবে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান জানান, তিনি সরকার ও দলের সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করছেন। তবে দলীয় পদ ছাড়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেননি। এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের দপ্তরে এখন পর্যন্ত এই নেতাদের কারো পদত্যাগপত্র জমা পড়েনি। এছাড়া দল থেকেও তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।
গত ১১ জুন দেশের আটটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও কক্সবাজারে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কক্সবাজারের প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন ছাড়া বাকি সাতজনই বর্তমান বা সাবেক দলীয় নেতা। এছাড়া ২৩ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপনে আরও ১১টি সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপির নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অন্তত ১৫ জন নিয়োগের সময় দলীয় পদে বহাল ছিলেন।
এই নেতাদের মধ্যে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম, সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবু, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু রয়েছেন।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ জানিয়েছেন, সংগঠন বলতে যদি রাজনৈতিক দল বোঝানো হয়, তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে, যদিও পুরো বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এখনো বিস্তারিত জানেন না। অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করে কিছু নেতা মনে করছেন, ‘সংগঠন’ বলতে হয়তো রাজনৈতিক দলকে বোঝানো হয়নি। তবে সরকার সংশ্লিষ্ট দুজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলও একটি সংগঠন এবং নিয়োগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করা বাধ্যতামূলক।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫ বিধিতে সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া বা কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সাবেক যুগ্ম সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, সরকারি সংস্থার প্রধানের পদ কোনো জনপ্রতিনিধির পদ নয়, এটি একটি সরকারি পদ। তাই এসব পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দলীয় পদ ত্যাগ করা উচিত। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে আজমত উল্লা খানের দলীয় পদে থাকার নজির রয়েছে, যা নিয়ে তখন সমালোচনা হয়েছিল।
গত ২৩ জুলাই দেওয়া এ নিয়োগ এক বছরের জন্য।অতিরিক্ত সচিব (গ্রেড-২) পদমর্যাদায় এ নিয়োগের শর্ত ছিল, অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক থাকলে তা পরিত্যাগ করতে হবে।বুলবুল বনশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে যোগ দিয়েছেন, কিন্তু বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদকের পদ
অর্থাৎ সরকারি নিয়োগে ‘সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের’ যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা তিনি মানেননি।.সরকার গত জুন ও জুলাইয়ে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশন এবং ৮টি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে বিএনপি ও দলের অঙ্গসংগঠনের বর্তমান ও সাবেক ১৭ নেতাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়।