দেশজুড়ে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্পখাত এখন মহাসংকটের মুখে। বুধবার থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় শত শত শিল্প-কলকারখানা অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং শিল্পমালিকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বায়ারদের অর্ডার বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, অবিলম্বে এই সংকটের সমাধান না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পুরো অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।
গ্যাস সংকটের নেপথ্যে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে সংকট নিরসনের তাৎক্ষণিক কোনো আভাস এখনো পাওয়া যায়নি। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত সরকারগুলোর ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে জাতিকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তবে রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হবিগঞ্জে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করলেও বুধবার থেকে জেলার ১৭১টি ছোট-বড় কারখানার প্রায় সবকটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দুই লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সাভার-আশুলিয়ার প্রায় দেড় হাজার শিল্পকারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেখানে বয়লার, ডায়িং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং বিভাগগুলো চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শিল্পমালিকদের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৮ পিএসআই। এই সংকটে চলতি মাসে সাভার-আশুলিয়ায় তিন থেকে চার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের দাবি, উলাইল, হেমায়েতপুর ও আশুলিয়ার ৩০০টির বেশি কারখানায় দুই হাজারের বেশি শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে, যার মধ্যে অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেডে এক সপ্তাহেই ৫৬৫ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে।
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসায় প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ফ্যাব্রিক সংকটে শতাধিক গার্মেন্টস বন্ধের উপক্রম হয়েছে। কোনো কোনো গার্মেন্টস একদিন উৎপাদনে যেতে পারলে পরের দুদিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শহরের একটি গার্মেন্টসে প্রায় ১,৫০০ শ্রমিক অলস বসে আছেন। এছাড়া নরসিংদীর একটি স্পিনিং মিলে জেনারেটর বন্ধ থাকায় ১,২০০ শ্রমিকের কাজ বন্ধ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের প্রায় সবই বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে চালকদের দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি। মন্ত্রী ১০ তারিখের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা বললেও এখন গ্যাস প্রায় নেই। তিনি জানিয়েছেন, সমাধান না হলে সোমবার সংবাদ সম্মেলন করা হবে। উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চললে কারখানা, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের চাকা থমকে যাবে এবং মালিকদের পক্ষে ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়বে।