সুনামগঞ্জের ছাতকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক কাঠজ্বালিত চুনের পাজু বা চুল্লি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এসব চুল্লিতে চুনাপাথর পোড়ানোর কাজে প্রতি মাসে প্রচুর পরিমাণ কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা জ্বালানি কাঠের সংকট ও বৃক্ষনিধনের আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এসব কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধের কারণে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ছাতক পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে শতাধিক পাজু চালু রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই সংখ্যা দুই শতাধিক হতে পারে। তবে পাজু ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের মতে, বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০টি চুল্লি সক্রিয় রয়েছে। সুরমা নদীর তীর, ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের দুই পাশ, বৌলা ও তাতিকোনাসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার আশপাশে এসব চুল্লি গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি চুল্লি স্থাপন করায় শিক্ষার্থী ও পথচারীরা নিয়মিত ধোঁয়া ও ধুলার কবলে পড়ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছাতকের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ থেকে ৩০টি কাঠবাহী ট্রাক ও পিকআপ ছাতকে প্রবেশ করছে, যা বনাঞ্চলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, তারা সরাসরি বন থেকে গাছ না কেটে বিভিন্ন করাতকলের উচ্ছিষ্ট কাঠ ব্যবহার করছেন। তবে চুনাপাথর উচ্চ তাপে পোড়ানোর সময় নির্গত ফ্লাইঅ্যাশ ও কালো ধোঁয়া বাতাসে মিশে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, যা শুষ্ক মৌসুমে আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ছাতক বর্তমানে একটি অঘোষিত শিল্পাঞ্চল ও দূষণপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। অবৈজ্ঞানিক এসব চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ছাই জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং শুষ্ক মৌসুমে শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়াতে পারে। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি এই শিল্পকে পরিবেশসম্মত উপায়ে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহানও জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে এলাকায় পরিবেশজনিত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
পাজু মালিকদের দাবি, তারা পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে ব্যবসা করছেন। পাজু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সালেক মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম জানান, এটি ছাতকের একটি পুরোনো ব্যবসা এবং এর সঙ্গে বহু মানুষ জড়িত। তারা পরিবেশসম্মতভাবে এই খাতকে বৈধতা দিয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাব দিলেও পরিবেশ অধিদপ্তর তা নাকচ করে দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাইমিনুল হক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো ছাড়পত্র নেই। ইতোমধ্যে তাদের নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি কাঠ সরবরাহ বন্ধে বন বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন জানান, কাউকে চুনের ভাটা স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদুস জনবল সংকটের কথা জানিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।