টানা সাড়ে চার বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পর অর্থাৎ আগের ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি যে হারে বাড়ছে, সাধারণ মানুষের মজুরি তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি চলছে, যেখানে প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি ছিল।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাবমতে, রাজধানীতে একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক ন্যূনতম ব্যয় ২৫ হাজার টাকার বেশি। এর মধ্যে বাসাভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার, খাদ্য ব্যয় ১০ থেকে ১২ হাজার, শিক্ষা ২ থেকে ৩ হাজার, চিকিৎসা ১ থেকে ২ হাজার, পরিবহন দেড় থেকে আড়াই হাজার এবং অন্যান্য খরচ ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রিয়াজ উদ্দিন জানান, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাঁর বেতন বাড়েনি, ২০২৬ সালে তা কিছুটা বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি দিয়ে এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক পরিবার মাছ, মাংস ও ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে সস্তা ও ক্যালরি-সর্বস্ব খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান জানান, মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে। অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি খাতের মজুরি বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়ন এবং বাজার সিন্ডিকেট তদারকির পরামর্শ দিয়েছেন।
দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী শ্রম আইনের সুরক্ষা বা ন্যূনতম মজুরির আওতার বাইরে রয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতেও পরিস্থিতি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়; দেশের ১০২টি স্বীকৃত শিল্প খাতের মধ্যে মাত্র ৪৭টিতে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি কার্যকর রয়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের দিনমজুর আতাউর কিংবা কারওয়ান বাজারের কর্মচারী মকবুল হোসেনের মতো মানুষরা এখন ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। বগুড়ার কৃষিশ্রমিক সাইদুল ইসলাম জানান, কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় তার আয় কমেছে, যার ফলে জমানো টাকা ভেঙে খাওয়ার পর এখন তিনি ঋণের বোঝায় জর্জরিত।
পুষ্টিবিদ সানজিদা শারমিনের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বাদ দিয়ে কেবল ক্যালরি গ্রহণের ফলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ও শিশুদের মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সর্বশেষ জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ হলেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। দেশের ৫ কোটি ৮০ লাখ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীর জন্য কোনো কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে।