ইসলামে ইতিহাসচর্চার যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত নবী করিম (সা.)-এর জীবনচরিত ও তাঁর যুদ্ধাভিযান অর্থাৎ গাজওয়া ও সিরাহ অধ্যয়নের মাধ্যমে। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাদের সন্তানদের এই ইতিহাস অধ্যয়নে উৎসাহিত করতেন এবং নিজেরাও তা নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা করতেন। পরবর্তীতে সাহাবা, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িনরা ঐতিহাসিক ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করার প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হন, যাতে হাদিসের সনদ সংরক্ষণে কোনো ধরনের বিচ্যুতি না ঘটে। সেই সাথে তারা ইসলামপূর্ব যুগের ঘটনাবলি, বিভিন্ন জাতির ইতিহাস, বংশগতি এবং পূর্বসূরিদের কাহিনি সংরক্ষণেও আগ্রহ প্রদর্শন করেন।
সূচনালগ্নে ইসলামি ইতিহাসচর্চা হাদিসশাস্ত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল এবং হাদিস বিশারদদেরই ইতিহাস গবেষণার পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধারার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বদের মধ্যে আবান ইবনে ওসমান ইবনে আফফান (রা.), যিনি খলিফা উসমান (রা.)-এর ছেলে এবং উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রা.), যিনি নবীজির স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন আসমা (রা.)-এর ছেলে, তাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইসলামি ইতিহাস বহু ধাপ ও ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে আজকের অবস্থানে এসেছে।
প্রথম পর্যায়ে ইতিহাসচর্চা ছিল সত্যতা ও পূর্ণ স্বাধীনতার যুগ। তখন ঐতিহাসিকরা কোনো ধরনের ধর্মীয় পক্ষপাত, রাজনৈতিক প্রভাব বা গোষ্ঠীগত মোহ ছাড়াই ঘটনাবলি সংরক্ষণ করতেন। তারা প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার পাশাপাশি জনশ্রুতির ওপর নির্ভর করলেও সত্যবিচ্যুতি ঘটত না, কারণ তারা যা শুনেছেন বা পেয়েছেন, তা কোনো কিছু যোগ-বিয়োগ ছাড়াই বিশ্বস্তভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই পর্যায়ের ইতিহাসচর্চা ছিল নিরপেক্ষতা ও সত্যনিষ্ঠতার দিক থেকে অনন্য।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ইতিহাসচর্চা অনেকটাই গল্পনির্ভর হয়ে পড়ে, যা ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষণে জটিলতা ও বিভ্রান্তি তৈরি করে। এই সময়ে অনেক তাফসিরকারী কোরআনের ব্যাখ্যার সময় বিস্তারিত তথ্যের অভাবে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ, পারস্য ও গ্রিক লোককথা এবং নব-মুসলিমদের প্রচলিত বর্ণনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এভাবেই 'ইসরায়েলিয়াত' হিসেবে পরিচিত বহিরাগত উপকথাগুলো ইসলামি বইপত্রে প্রবেশ করে। এই যুগের ইতিহাসবিদরা তথ্যের গভীর বিশ্লেষণের চেয়ে বরং তথ্য সংগ্রহ ও সনদ যাচাইয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতেন, ফলে ইতিহাস তখন পাঠ্য সমালোচনার অভাবে কেবল তথ্যভিত্তিক দলিলে পরিণত হয়।
তৃতীয় পর্যায়ে সমালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের যুগ শুরু হয়। এই পর্যায়ে একদল সচেতন ইতিহাসবিদের আবির্ভাব ঘটে, যারা পূর্ববর্তী সময়ে অনুপ্রবেশ করা ইসরায়েলি উপকথার ক্ষতিকর প্রভাব ও বিভ্রান্তি দূর করার প্রচেষ্টা চালান। এই গবেষকরা কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়, বরং পূর্ববর্তী সংকলিত তথ্যের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ও সত্যতা যাচাইয়ে মনোনিবেশ করেন। এভাবেই ইসলামি ইতিহাস চর্চা ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে বিশুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতার দিকে অগ্রসর হয়েছে।