দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি বর্তমানে কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ও স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছাড়াই চলছে। ব্যাংকটির নিয়মিত এমডির পদটি সাড়ে তিন মাসের বেশি সময় ধরে শূন্য রয়েছে, যা ব্যাংক কোম্পানি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী এমডি পদ শূন্য হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তা পূরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত এমডি দিয়েই চলছে ব্যাংকটির দৈনন্দিন কার্যক্রম। পরিচালনা পর্ষদ ও এমডি না থাকায় ব্যাংকটিতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গ্রাহকসেবা ও ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমে।
ইসলামী ব্যাংকের এই সংকটের সূত্রপাত চলতি বছরের মে মাসে। গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। ওই রাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর জুনের শুরুতে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের বিক্ষোভ, আন্দোলন ও আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়লে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা দিলেও সংকট নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলস্বরূপ, গত ১৪ জুন ব্যাংকটির পুরো পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. জহির হোসেনকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একক দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত তিন মাস ধরে তিনি দায়িত্ব পালন করলেও পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে রয়েছে।
নিয়মিত এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। ব্যাংকের সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে গত ১৩ এপ্রিল তৎকালীন বোর্ড ছুটিতে পাঠায়। ছুটি শেষে তিনি আর ব্যাংকে যোগ দিতে পারেননি এবং পরবর্তীতে পদত্যাগ করেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, এমডি পদ সর্বোচ্চ তিন মাস শূন্য রাখা যায় এবং এর বেশি সময় অতিবাহিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন এমডি নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে পর্ষদের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেন জানান, তিনি পর্ষদের একটি অংশ মাত্র এবং এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ প্রয়োজন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকায় এখন প্রশাসক নিয়োগের প্রয়োজন নেই এবং পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনের জন্য যোগ্য লোক খোঁজা হচ্ছে।
এস আলম গ্রুপের আমলে করা নিয়মের কারণে ইসলামী ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হতো। বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় ভারপ্রাপ্ত এমডিসহ আটজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন আটকে আছে। ইতিমধ্যে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদারের মেয়াদ গত ১১ সেপ্টেম্বর এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আলম ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুর রহমানের মেয়াদ ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পুনর্নিয়োগের জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হলেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না জহির হোসেন। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্বহীনতা থাকলে ব্যাংকের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা আরও প্রকট হবে。
চলমান অস্থিরতার বড় প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলোতে। ব্যাংকটির আমানত ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ১ লাখ conci হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি খেলাপি ঋণের পরিমাণ জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ শতাংশ এবং দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ। ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু পরিকল্পনা নিলেও নতুন পর্ষদ গঠন নিয়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতায় তা বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমানে ব্যাংকটিতে নতুন কোনো ব্যবসা বা বিনিয়োগের অগ্রগতি নেই, কেবল আমানত সংগ্রহের কাজ চলছে।
ইসলামী ব্যাংকের এই অচলাবস্থার কারণে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ব্যাংকটির মাধ্যমে শত শত পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং আমদানি-রপ্তানির জন্য এলসি খোলা হয়। কিন্তু বর্তমানে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও এলসি খুলতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী ঝুঁকিতে পড়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বড় শিল্প উদ্যোক্তা জানান, তার চারটি তৈরি পোশাক কারখানার চার হাজার কর্মীর বেতন ও এলসি এই ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। কিন্তু ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অসহায়ত্বের কারণে তিনি চরম সংকটে পড়েছেন। করপোরেট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঋণ নবায়ন, সীমা বৃদ্ধি বা নতুন ঋণ সুবিধার মতো বড় প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উচ্চপর্যায়ের পর্ষদ প্রয়োজন হলেও তা না থাকায় ফাইলগুলো আটকে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই দীর্ঘসূত্রতা চলতে থাকলে করপোরেট গ্রাহকরা বিকল্প ব্যাংকের দিকে ঝুঁকবেন, যা ইসলামী ব্যাংকের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সরকারি চাকরিবিধি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত চাকরির বয়সসীমা ৬০ বছর পর্যন্ত। আর ৬৫ বছর পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত থাকতে পারে।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে নানা ধরনের পরিকল্পনা হাতে নেয়। যেসব পরিকল্পনা শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বাস্তবায়ন শুরু করে। এতে ব্যাংকটি অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।