জাতীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধ থাকার সমীকরণ থাকলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভিন্ন পথে হাঁটছে ১১ দলীয় জোটের প্রধান দুই শরিক জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার জোর প্রস্তুতি নিয়েছে জামায়াত। অন্যদিকে এনসিপি ও জোটের অন্যান্য শরিক দলগুলোও নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে ভোটের মাঠে নামছে। ফলে জোটের শরিকদের এই মুখোমুখি অবস্থান দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইতিমধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত ও এনসিপি। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটিতে মহানগর উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে জামায়াত। অন্যদিকে, এনসিপির পক্ষ থেকে উত্তরে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। জানা গেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর আসিফ মাহমুদ ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে লড়ার ঘোষণা দিলেও জোটের প্রধান দল জামায়াতের সবুজ সংকেত না পেয়ে নিজস্ব প্রস্তুতিতে এগোয় এনসিপি। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজেদের ভোটার এলাকা স্থানান্তর করেছেন; আসিফ উত্তরে এবং নাসীরুদ্দীন দক্ষিণে এসেছেন।
স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয়ভাবেই হবে—এই নীতিকে সামনে রেখে ১৩টি সিটি করপোরেশনেই এককভাবে লড়াইয়ের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ও vote-bank যাচাই করার লক্ষ্যে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সুপারিশে মেয়র প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে গত ১১ আগস্ট রাজশাহী সিটিতে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। জামায়াতের সম্ভাব্য অন্য প্রার্থীরা হলেন—নারায়ণগঞ্জে মহানগর আমীর মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, গাজীপুরে ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, চট্টগ্রামে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, বরিশালে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল এবং নবগঠিত বগুড়া সিটিতে আ.খ.ম. আব্দুল মালেক। খুলনায় দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত মহানগর আমীর মাহফুজুর রহমানকে দলের গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রংপুরে টিকিট পাচ্ছেন মহানগর আমীর এটিএম আজম খান।
সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে জামায়াত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা না করলেও বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লায় মহানগর আমীর মোসলেহ উদ্দিন, সিলেটে জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা লোকমান আহমদ এবং ময়মনসিংহে মহানগর সেক্রেটারি অধ্যাপক শহীদুল্লাহ কায়সারকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এদিকে এনসিপিও অন্যান্য সিটিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করছে। দলটি কুমিল্লা সিটিতে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক এডভোকেট তরিকুল ইসলাম, সিলেটে মহানগর আহ্বায়ক আব্দুর রহমান আফজাল এবং রাজশাহীতে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলীকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। উল্লেখ্য, নির্বাচনী জোট গঠনের কয়েক মাস পর গত ২৫ জুলাই ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যায় খেলাফত মজলিস।
এ বিষয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য জামায়াত সাংগঠনিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া প্রায় শেষ। ঢাকার দুই সিটির প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও সময়মতো তা জানানো হবে। জোটে কোনো প্রভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে যে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিটি দল নিজস্ব প্রার্থী দেবে, এখানে কোনো জোটগত প্রার্থী থাকবে না। অন্যদিকে এনসিপির নীতি নির্ধারণী ফোরামের সদস্য ও মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, এককভাবে স্থানীয় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত আমাদের আগে থেকেই ছিল। এতে জোটে কোনো টানাপড়েন তৈরি হবে না, বরং নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে এবং দল গোছানো সহজ হবে।