কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর গতকাল শনিবার বেলা একটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুই কিশোরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকত। তার মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসায়ী। প্রায় ১৬ বছর আগে বিয়ে হওয়া এই দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিল অপ্রতিম। চারতলা ভবনের তৃতীয় তলার যে ফ্ল্যাটটিতে তারা থাকতেন, তার দরজার পাশে কাঠের ওপর খোদাই করে লেখা রয়েছে, ‘অপ্রতিমদের বাসা, প্রযত্নে নাহিদ ও শাহরিয়ার’। ঘরের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে অপ্রতিমের শৈশব থেকে কিশোর হয়ে ওঠার নানা মুহূর্তের ছবি, যা এখন কেবলই স্মৃতি।
শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় না ফেরায় পরিবারের পক্ষ থেকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে গত ১৩ জানুয়ারি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যে ‘ফ্রি হেল্পলাইন’ (১৩২১৯) চালু করেছে, তার অধীনে প্রথমবারের মতো জরুরি সতর্কতা-ব্যবস্থা ‘মুন অ্যালার্ট’ (মিসিংurgent নোটিফিকেশন) ব্যবহার করে ফেসবুকে অপ্রতিমের ছবিসহ সন্ধান চাওয়া হয়। মায়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস ও মুন অ্যালার্টের কারণে নিখোঁজের খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
নিখোঁজের পর অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হলে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কোটবাড়ি এলাকার গন্ধমতীতে তার উপস্থিতি পাওয়া যায়। এরপর থেকেই ফোনটি বন্ধ ছিল। গতকাল বেলা ১১টার দিকে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ প্রথম দেখতে পান স্থানীয় শ্রমিক মোহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী ও তাঁর সঙ্গে থাকা এক কিশোর। জিলানী জানান, জঙ্গল দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ভাতিজা এক শিশুকে পড়ে থাকতে দেখে। কাছে গিয়ে মাথায় রক্ত দেখে তারা ভয় পেয়ে কাজ ফেলে চলে আসেন। পরে মামুন নামের এক স্থানীয় ব্যক্তির মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুপুর একটায় লাশ উদ্ধার করে।
অপ্রতিমকে হত্যার পর তার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া মায়ের আইফোনটি উদ্ধার করেছে জেলা পুলিশের একটি দল। গতকাল রাত আটটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সালমানপুর এলাকায় এক কিশোরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ফোনটি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক দুই কিশোরের বয়সই ১৭ বছর। তাদের মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা যাওয়া এক কিশোরকে পুলিশ আটক করেছে। অপর কিশোরকে গতকাল বিকেলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বেলতলী এলাকা থেকে আটক করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ১১-এর সিপিসি-২ কুমিল্লার একটি দল, যার নেতৃত্ব দেন উপপরিচালক ও অধিনায়ক মেজর সাদমান ইবনে আলম।
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে অপ্রতিমের মা-বাবা এখন পুরোপুরি দিশেহারা। মা নাহিদা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন আর আহাজারি করে বলছেন, ‘আমার ছোট্ট ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন? আমার তো সব শেষ হয়ে গেল।’ বাক্রুদ্ধ বাবা শাহরিয়ার জানান, শুক্রবার দুপুরে ছেলেকে খাইয়ে তিনি বাইরে যেতে বারণ করেছিলেন এবং বিকেলে একটি ভালো উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একসঙ্গে মুভি দেখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে যাওয়ার কথা বলে অপ্রতিম বের হয়ে আর ফেরেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এইরকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম।’
অপ্রতিমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী জাহান জানান, অপ্রতিম পড়াশোনায় ভালো এবং অত্যন্ত শান্ত, মিশুক স্বভাবের ছিল। তার কোনো শত্রুতা বা নেতিবাচক আচরণ কখনো দেখা যায়নি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের সন্তানের লাশ কত ভারী, তা বোঝানোর ক্ষমতা নেই।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম জানিয়েছেন, আজ রোববার সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা এবং বেলা ১১টায় গন্ধমতী এলাকায় তাদের বাসার কাছে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে।
এদিকে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে গতকাল বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটক থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ছাত্র আন্দোলন চত্বরে গিয়ে শেষ করেন। শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া ও শানীন অশ্রু অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ ও জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আজ রোববার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমি লজ্জিত, আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা এ সমস্ত মাসুম বাচ্চাদের রক্ষা করতে পারলাম না।’ অপ্রতিমের মাথায় আঘাতের ধরন ভারী বস্তু নাকি ধারালো অস্ত্রের, তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান। গতকাল রাত ১১টা পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের না হলেও অভিযোগ পেলেই তা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে এবং আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আজ রোববার দুপুর ১২টায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।