দেশে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে একলাফে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রোববার রাত ১২টা থেকে এই নতুন দর কার্যকর করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে মানুষের টিকে থাকা চরম কঠিন হয়ে পড়বে।
রোববার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হবে। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, পেট্রলের দাম ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে জুনে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বৃদ্ধি পায়। ফলে সর্বশেষ দাম ছিল ডিজেল ১১৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা।
দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি। এই অবস্থায় তেলের দাম আরও বাড়ায় মূল্যস্ফীতি মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে এম শামসুল আলম বলেন, সরকার প্রথমে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, এখন বাড়াল তেলের দাম। এরপর হয়তো গ্যাসের দামও বাড়ানো হবে। এতে সাধারণ মানুষের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৪ শতাংশ বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এতে কেবল ১৪ লাখ মানুষের বেতন বেড়েছে, কিন্তু বাকি অধিকাংশ মানুষের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। মানুষের যদি পণ্য কেনার সামর্থ্যই না থাকে, তবে শুল্ক-কর কোথা থেকে আসবে? তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার যতটুকু ভর্তুকি কমাতে চাইছে, তার চেয়ে বেশি রাজস্ব হারাতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যান্য দিকে জ্বালানি বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরও গত পাঁচ মাস দেশে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ থেকে বিশ্ববাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেল ও জাহাজভাড়া দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান হচ্ছে প্রায় ৮৯ টাকা, যা দৈনিক প্রায় ১০৯ কোটি টাকার সমান। এই হিসাবে কেবল ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতো। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে। এছাড়া বর্তমানে ভারতের কলকাতায় ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৫ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা। বাংলাদেশে দাম কম থাকলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয় বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে দেশের ইতিহাসে একলাফে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করে, যা পরে সমালোচনার মুখে ৫ টাকা কমানো হয়। তেলের সেই মূল্যবৃদ্ধি দেশের জিনিসপত্রের দাম এবং পরিবহনভাড়া ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
তখন কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়।
মানুষের টিকে থাকা চরম কঠিন হবে।সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০-১৪৪ শতাংশ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে শামসুল আলম বলেন, ১৪ লাখ মানুষের বেতন বাড়ল।