খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের পূর্ব পাশে অবস্থিত একটি চারতলা ছাত্র মেসে চুরির অপবাদে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আজমুল হোসেন নামের এক শিক্ষার্থীকে। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে চুরির অভিযোগ তুলে তাঁকে মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে তিনি ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান। নিহত আজমুল খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার তিতুদহ ইউনিয়নের বড়শলুয়া গ্রামে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার রাতে নিজ গ্রামে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। তবে আজমুল ছাদ থেকে স্বেচ্ছায় লাফ দিয়েছেন নাকি তাঁকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে এখনো রহস্য কাটেনি।
মসজিদের গলির ওই হালকা গোলাপি রঙের চারতলা ভবনের প্রতিটি তলায় আটটি করে কক্ষ ও দুটি করে শৌচাগার রয়েছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে পৌনে একটা পর্যন্ত মেসে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি এবং পুরো ভবনের সব কক্ষে তালা দেওয়া ছিল। তবে দুপুরের পর নিচতলার তিনটি ও দোতলার দুটি কক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীর দেখা মেলে। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার সব কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল। চতুর্থ তলার ‘ডি-৮’ নম্বর কক্ষে থাকতেন আজমুল। কক্ষগুলো তালাবদ্ধ থাকলেও বাইরে কাপড় ও জুতা-স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়। নিচতলার কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে চিল্লাচিল্লি ও দৌড়াদৌড়ির শব্দ শুনে তাঁরা বাইরে এসে আজমুলকে নিচে পড়ে থাকতে দেখেন।
মেসের রান্নার কাজ করা ফাতেমা জানান, ভবনটির তৃতীয় তলার ৯ জন শিক্ষার্থী মিল সিস্টেমে খেতেন, তবে আজমুলের কোনো মিল ছিল না। শুক্রবার রাতে তিনি লাউ দিয়ে মাছ রান্না করেছিলেন। সেই রাতে খাবার কম পড়লে শিক্ষার্থীরা চুরির সন্দেহে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে তারা আশেপাশের কয়েকজন প্রতিবেশীকেও ডেকে নেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রতিবেশী জানান, শিক্ষার্থীরা তিনতলা থেকে শুরু করে সব রুমে তল্লাশি চালায়। একপর্যায়ে চতুর্থ তলার ‘ডি-৮’ নম্বর কক্ষে আজমুলের খাটের নিচে অর্ধেক খাওয়া ভাত ও মাছের প্লেট পাওয়া যায়। এরপরই কয়েকজন আজমুলকে চড়থাপ্পড় মারা শুরু করে। প্রতিবেশীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের থামাতে পারেননি।
খবরটি ছড়িয়ে পড়লে আশেপাশের মেস থেকেও অনেকে ছুটে আসেন। উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা আজমুলকে ছাদে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর বাবার কাছে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করা হয় এবং জিনিসপত্র ফেরত দিতে বলা হয়। তবে ছাদ থেকে তিনি কীভাবে নিচে পড়লেন, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। রাত দেড়টার দিকে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘কোনো বাবাকে যেন আমার মতো সন্তানের লাশ বহন করতে না হয়।’
এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় প্রায়ই মুঠোফোন, ল্যাপটপ, কাপড় ও স্যান্ডেল চুরির ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর দাবি জানালেও ভবনমালিক সরোয়ার হোসেন কোনো পদক্ষেপ নেননি। ভবনটি দেখাশোনা করতেন তাঁর জামাতা আকিবুর রহমান। তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগে আজমুল এই মেসে উঠেছিলেন। পুরো মেসটি দেখাশোনা করতেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মেহেদী, যিনি মেসের ম্যানেজার ছিলেন। ঘটনার পর থেকে মেহেদীর কক্ষটি তালাবদ্ধ এবং তাঁর মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে।
ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বাদী হয়ে নগরের হরিণটানা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন ৪ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।