আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের পেশাগত সুরক্ষা, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ গঠনকে প্রতিপাদ্য করে এ বছর দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে ১০০ জন শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। তবে শিক্ষকদের মর্যাদা ও পেশাগত স্বাধীনতার এই বিশেষ দিনে দেশের শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক রাজনীতি, দলাদলি ও ক্ষমতার পালাবদলে শিক্ষকদের হেনস্তা হওয়ার পুরোনো চিত্রটি আবারও সামনে এসেছে। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তা শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গত দুই বছরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় উপাচার্য বদল হয়েছে কয়েক দফায়। দেশের ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাঁদের প্রায় সবাই বিএনপিপন্থী শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মূলত নীল দলের শিক্ষকেরাই এসব পদে আসতেন। ক্ষমতার এই পালাবদলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব আগের মতোই বজায় রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকার সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পছন্দের লোক বসাতে চায়, আর কিছু শিক্ষকও পদপদবির জন্য সরকারের অনুগ্রহ পাওয়ার চেষ্টা করেন। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলবাজির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
দলীয় রাজনীতির এই প্রভাব শুধু উপাচার্য নিয়োগেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন ঘটছে। বর্তমানে ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘গোপন রাজনৈতিক তৎপরতার’ অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, কেন এই তদন্ত কমিটিকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে অন্তত ৩২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন administrative ও একাডেমিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিনাত হুদাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, যার পেছনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে জিনাত হুদা দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং মূলত শিক্ষক সমিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের একাংশের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৬০ জনের বেশি শিক্ষক বিভাগীয় সিদ্ধান্তে বা নিজ উদ্যোগে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত ছিলেন। এদিকে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে। যেমন, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্য নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের পরিবারের ৯ জন সদস্যকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন অভিযোগে ৩৮ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৭ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ১১ জনকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ১৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্তের পর ১০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাঙ্গনের এই অস্থিরতা কেবল উচ্চশিক্ষার স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি স্কুল-কলেজেও ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করার ঘটনা ঘটেছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও সহকারী অধ্যাপক ফারহানা খানম ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট মবের শিকার হয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যা নিয়ে বর্তমানে আদালতে মামলা চলছে। একইভাবে ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ বেদারউদ্দিন আহমেদকেও জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। ২০২৫ সালের মার্চে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর পদত্যাগ সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সঠিক হয়নি।
জোরপূর্বক পদত্যাগ ও অপসারণের শিকার শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের সংগঠনে প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগী শিক্ষক রয়েছেন। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্রমতে, প্রায় ৯৫০ জন শিক্ষকের এমপিও এবং প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষকের প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই রাজনৈতিক প্রভাব দূর করতে সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের রাজনীতি বন্ধে একটি আচরণবিধি তৈরির কথা ভাবছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানান, এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধের পক্ষে। এ ছাড়া ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত ও তদন্ত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’।
শিক্ষাবিদেরা মনে করেন, শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা জরুরি। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দলবাজি বন্ধের জন্য শিক্ষকদের চেয়ে সরকারের দায় বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখা, কিন্তু বর্তমানে সেই গণতান্ত্রিক মডেল আর কার্যকর নেই। শিক্ষকদের কম বেতন-ভাতার কারণেও অনেকে অর্থনৈতিক লাভের জন্য অন্য দিকে ঝুঁকছেন, যা শিক্ষার গুণগত মানকে ব্যাহত করছে।