জন্মসনদে ‘ক্জ্ক্ল্জ্’, ‘লক্জ্ক্’, ‘দতককা’ কিংবা ‘LJKLJF’-এর মতো অদ্ভুত সব নামের ভুল নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ নাগরিকেরা। নিবন্ধন কার্যালয়ের করা এসব ভুলের দায় ও সংশোধনের খরচ এখন বইতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদেরই। ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস পালিত হলেও বাস্তবে জন্মনিবন্ধন সংশোধন করতে গিয়ে ঘরে ঘরে নাগরিকদের নাভিশ্বাস উঠছে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা কানিজ ফাতেমার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ১১ বছর বয়সী ছেলে এবার বৃত্তি পরীক্ষা দেবে। স্কুল থেকে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় জন্মসনদ চাওয়ায় তিনি ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখেন, ছেলের বাংলা নাম লেখা ‘ক্জ্ক্ল্জ্’ আর স্বামীর নাম ‘লক্জ্ক্’। ২০১৫ সালে তিনি শুধু ইংরেজিতে ছেলের জন্মসনদ নিয়েছিলেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৪ কার্যালয়ে (মিরপুর-১০) গিয়ে দেখা যায় এমন অনেক ভুক্তভোগীর ভিড়। সেখানে মিজানুর রহমান নামের একজন এসেছেন মায়ের নাম ‘শাহানা’র জায়গায় ‘দতককা’ সংশোধন করতে। নাছির আহম্মেদ বেলাল নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, তাঁর বড় মেয়ের সনদে বাবা-মায়ের নামের জায়গায় লেখা এসেছে ‘LJKLJF’। ফারজানা রহমান নামের এক অভিভাবক জানান, তাঁর সন্তান, স্বামী ও নিজের নাম এসেছে ‘ইউওইউও’। তুহিনা আক্তার নামের আরেক মায়ের মেয়ের নাম ঠিক থাকলেও বাবা-মায়ের নামের জায়গায় শুধু ‘০’ ও ‘-’ বসানো হয়েছে। এই প্রতিবেদন তৈরিতে যে আটজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁদের জন্মসনদ ২০২০ (2020) সালের আগে করা।
নিবন্ধন কর্মকর্তাদের মতে, তিন বছর আগে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় একসঙ্গে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। তখন কেউ কেবল এক ভাষায় আবেদন করলে নিবন্ধন কার্যালয় বা কম্পিউটারের দোকানের কর্মীরা অন্য ভাষার ঘরটিতে ইচ্ছেমতো বা এলোমেলো অক্ষর টাইপ করে দিতেন। ২০২৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে এবং ভিসা জালিয়াতি রোধে এক পাতায় দুই ভাষায় সনদ দেওয়া শুরু হয়। ফলে আগের যেকোনো একটি ভাষার ভুল এখন পুরো সনদটিকে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তুলেছে। এই ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় অনলাইন আবেদন, স্থানীয় কাউন্সিলর বা অঞ্চল কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক এবং পুনরায় অঞ্চল কার্যালয়—এই চার ধাপ পার হতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রেও ইউপি থেকে ইউএনও কার্যালয় ঘুরে আবার ইউপিতে আসতে হয়।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি জন্মনিবন্ধন এবং ৫ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি মৃত্যুনিবন্ধন হয়েছে। এই সময়ে নতুন-পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ জন্মনিবন্ধন এবং সাড়ে ৪ হাজার মৃত্যুনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে। গত বছর এই সংশোধনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৯ লাখ ১৭ হাজার। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ভুল সংশোধনে সরকার নির্ধারিত ফি ৫০ টাকা। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই সংশোধনের ফি বাবদ নাগরিকেরা দিয়েছেন সাড়ে ১৭ কোটি টাকা এবং গত বছর দিয়েছেন ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। এর বাইরে কম্পিউটারের দোকান থেকে আবেদন করতে গিয়ে নাছির আহম্মেদের মতো নাগরিকদের অতিরিক্ত ৩০০ টাকা পর্যন্ত গুণতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে শুধু বাংলা সনদের ভুলই ছিল প্রায় ১০ কোটি, যার সম্পূর্ণ দায় নিবন্ধন কার্যালয়ের। তখন বিনা মূল্যে ভুল সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকারি কর্মকর্তারা তাতে রাজি হননি। এদিকে গবেষণা সংস্থা প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের জানান, নিবন্ধন কার্যালয়ের এই ভুলগুলোকে অনেকে ‘ইচ্ছাকৃত’ বা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ৬৭ শতাংশ শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্ম নেয়। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ সংশোধন করে এসব প্রতিষ্ঠানকে জন্মের পরপরই নিবন্ধনের দায়িত্ব দিলে ভোগান্তি কমবে।
মোহাম্মদ আমির হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তাঁর বোনের ২০০৮ সালের জন্মসনদটি ইব্রাহিমপুরের ঠিকানায় অঞ্চল-৭-এ ছিল, যা এখন অঞ্চল-৪-এ স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরিত না হয়ে সেটি দুই অঞ্চলেই ভুল তথ্যসহ দেখাচ্ছে। এ নিয়ে তিনি সাত দিন ধরে ঘুরছেন। সার্বিক বিষয়ে registrar general (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, আগের ভুলগুলো কয়েক বছর ধরে সংশোধন করা হচ্ছে। ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগের সঙ্গে জন্মনিবন্ধন যুক্ত। ডিজিটাল সুশাসনের সুবিধা পেতে জন্মনিবন্ধন নির্ভুল হওয়া জরুরি। তিনি নাগরিকদের নিজের আবেদন নিজে করার পরামর্শ দেন যাতে ভুল এড়ানো যায়।