যমুনা নদীর ওপর নির্মাণাধীন রেল সেতু প্রকল্পে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) অধীনে পরিচালিত এক বিশেষ নিরীক্ষায় এই অনিয়ম ধরা পড়ে। অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী সেতুর স্টিল গার্ডার ট্রাস জাপান বা ভিয়েতনাম থেকে আমদানির কথা থাকলেও তা আনা হয়েছে মিয়ানমার থেকে।
বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের তৈরি এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে আর্থিক বিবরণী, বিধিবিধানের বাস্তবায়ন এবং প্রকল্পের কর্মদক্ষতা—এই তিনটি প্রধান দিক খতিয়ে দেখা হয়। নিরীক্ষায় মোট ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি ক্ষতি চিহ্নিত করা হয়েছে।
যমুনা সেতুর প্রায় ৩০০ মিটার উজানে সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাকের এই রেল সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটির আওতায় রেলওয়ে ভায়াডাক্ট, নতুন রেলপথ, ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণসহ বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম স্টেশনের আধুনিকায়ন এবং কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুরুতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা, যার সিংহভাগ অর্থায়নের কথা ছিল জাইকার (জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা) ঋণে। তবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সময় বাড়িয়ে তা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৭২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকায়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় অনিয়মটি ঘটেছে স্টিল পাইপ শিট পাইল (এসপিএসপি) প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে। সেতু নির্মাণে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এই প্রযুক্তি যুক্ত করার কারণে সরকারের প্রায় ৭,০৪৭ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া, প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত এসপিএসপি কাজ দেখিয়ে শুল্ক ও ভ্যাট পরিশোধের মাধ্যমে সরকারের আরও প্রায় ১০৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অনিয়ম প্রসঙ্গে সরকারি রেল পরিদর্শক (জিআইবিআর) এবং পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী বলেন, যেকোনো প্রকল্পে কোনো বিশেষ প্রযুক্তি বা প্রকৌশলগত পদ্ধতি যুক্ত করার আগে তার প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়-সাশ্রয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অডিটে যদি চুক্তিবহির্ভূত কাজ, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ বা অতিরিক্ত ব্যয়ের মতো কোনো অভিযোগ উঠে আসে, তবে সেগুলোর যথাযথ প্রকৌশলগত ও আর্থিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।