বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘ইমপ্রুভমেন্ট অব আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস প্রজেক্ট’ (আইইউপিএইচপিএসপি) ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটিতে শীর্ষস্থানীয় অন্তত তিনজন বিশেষজ্ঞের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাদের নিয়োগের শর্ত বা টার্মস অব রেফারেন্সের (টিওআর) কোনো মিল পাওয়া যায়নি। অথচ তাদের প্রত্যেকের বেতন ধরা হয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা করে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) থাকা নিয়োগের শর্তাবলি পরিবর্তন করা হয়েছে। যেসব বিশেষজ্ঞ নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের অন্তত তিনজন নিজেদের টিওআর নিজেরাই তৈরি করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিজেদের তৈরি করা সেই মানদণ্ডও তারা পূরণ করতে পারেননি।
এই প্রকল্পে আউটসোর্সিং চুক্তির মাধ্যমে ২৪০ জনের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে অস্তিত্বহীন বিশেষায়িত ডেঙ্গু গবেষণা ল্যাবরেটরির জন্য ১৮৬ জন এবং তিন সিটি করপোরেশন ও দুই পৌরসভা না চাইলেও মশা ও বাহক-নিয়ন্ত্রণ কাজের জন্য ৫৪ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গ্রেড ৬-২০ পর্যন্ত বেতনের এসব কর্মী সরবরাহের জন্য গত বছরের ২২ জুন টেন্ডার আহ্বান করা হয়।
প্রকল্পের মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন স্পেশালিস্ট পদে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আমিনুল ইসলাম, এনভায়রনমেন্ট স্পেশালিস্ট হয়েছেন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. বিল্লাল হোসেন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে আছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. মহঃ শের আলী এবং বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট পদে আছেন হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করা এনামুল হক। এই চারজনের বেতন চার লাখ ৪৪ হাজার টাকা করে। এছাড়া ফিনান্সিয়াল স্পেশালিস্ট এস এম আব্দুল মোত্তালিব ও পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্ট ড. শারমিন মিজানের বেতনও একই অংকের।
ডিপিপি ও সংশোধিত টিওআরের সঙ্গে তাদের নথিপত্র মিলিয়ে দেখা গেছে, অন্তত তিনজনের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কোনো মিল নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে এম.কম পাস করা আমিনুলের অভিজ্ঞতার নথিতে মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশনের কোনো প্রমাণ নেই। প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট শের আলী অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রিধারী। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বিল্লাল হোসেনের ক্ষেত্রে ডিপিপির শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন পদে নিয়োগ পাওয়া এনামুল হক ঢাকা সিটি কলেজ থেকে বি.কম এবং জগন্নাথ কলেজ থেকে এম.কম পাস করা, যার বিসিসি ব্যবস্থাপনায় ১০ বছরের অভিজ্ঞতার কোনো প্রমাণ নেই। গত ২৯ জুন তাকে প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। ১২ জন বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রকাশ করা হয় এবং তারা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, আমিনুল, এনামুল ও শের আলী টিওআর তৈরি ও বিশেষজ্ঞ বাছাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এমনকি আনুষ্ঠানিক নিয়োগের আগেই তারা প্রকল্পের কার্যালয়ে বসে নথিপত্র তৈরির কাজ করেছেন।
ল্যাবরেটরির নির্মাণ কাজের টেন্ডার ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট প্রকাশ করা হয় এবং ২৭ সেপ্টেম্বর তা খোলা হয়, তবে এখনো কার্যাদেশ জারি হয়নি। যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রের জন্য কোনো টেন্ডারই হয়নি। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনে শেষ হচ্ছে, তাই ল্যাব চালুর আগেই কর্মীদের মেয়াদের বড় অংশ শেষ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ্ খান জানান, আরডিপিপি তৈরি ও নতুন কস্ট এস্টিমেট প্রণয়নে সময় লেগেছে। ২৪০ জনের মধ্যে ১০০ জনের বেশি কর্মীকে প্রশিক্ষণ শেষে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মনিরুল ইসলাম জানান, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও অনুমোদনে টিওআর পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের টাস্ক টিম লিডার ইফফাত মাহমুদ জানিয়েছেন, জনবল নিয়োগের দায় বাস্তবায়নকারী সংস্থার এবং বড় চুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক তদারকি করে থাকে। কোনো অনিয়ম থাকলে তা তাদের ইন্টেগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সিতে জানানোর সুযোগ রয়েছে।