পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের দৈনিক উপস্থিতি ও রাতযাপনের সময়সীমা একলাফে বড় পরিমানে বাড়িয়েছে সরকার। প্রতিবেশগত সহনশীলতা নির্ধারণে হালনাগাদ কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের মতে, আগে দৈনিক দুই হাজার পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো পরিকাঠামোই দ্বীপে তৈরি হয়নি। সেখানে নতুন করে আরও দেড় হাজার পর্যটক বাড়ানোর ফলে দ্বীপের সুপেয় পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক প্রাণপ্রকৃতি মারাত্মক সংকটে পড়বে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করতে পারবেন। এতে বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর থেকেই দ্বীপে রাতে থাকার অনুমতি থাকবে, যা আগে কেবল ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাসে সীমাবদ্ধ ছিল। ভ্রমণকারী প্রতিটি পর্যটককে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাহাজমালিক ও হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা দিনে অন্তত ছয় হাজার পর্যটক নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন বৈঠকের পর সরকার এই সীমা সাড়ে তিন হাজারে নির্ধারণ করে।
সংবেদনশীল এই দ্বীপটির ভৌগোলিক সুরক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরিবেশ বিধিমালা অনুযায়ী সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বারবিকিউ করা এবং কেয়াবন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনে অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত রোধে অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে দৈনিক দুই হাজার পর্যটকের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। বছরের বাকি সময় পর্যটন বন্ধ থাকায় গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণ করেন, যা আগের তিন বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। সাময়িক এই বিধিনিষেধের কারণে দ্বীপে সুপেয় পানির অপচয় ও বর্জ্যের দূষণ কমে আসায় পরিবেশগত ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল।
এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনের অধিবাসীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, যার আওতায় পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে দুই মাসের আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক ও প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে একটি মহাপরিকল্পনার খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে দৈনিক সীমা ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ায় এসব অর্জন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পর্যটক বাড়লে হোটেল-রিসোর্টে পানির ব্যবহার, পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিকের বোতল ও মোড়কের আধিক্য বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা সমুদ্রের পানি ও উপকূলকে মারাত্মকভাবে দূষিত করবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জানান, বৈজ্ঞানিক বহনক্ষমতা অনুযায়ী সেন্ট মার্টিনে দিনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ পর্যটক যাওয়া যুক্তিযুক্ত। কক্সবাজারের মতো গণপর্যটন কোনোভাবেই এই সংবেদনশীল প্রবাল দ্বীপে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সুপেয় পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন না করে পর্যটন ব্যবসায়ীদের সন্তুষ্ট করতে এভাবে পর্যটক বাড়ানো দ্বীপের প্রাণপ্রকৃতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
একই সুর প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, পর্যটক বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। রিসোর্ট মালিক ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতীতে দুই হাজার পর্যটক নিয়ন্ত্রণ করতেই যেখানে প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়েছে, সেখানে সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের ওপর নজরদারি পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি পর্যটকদের কাছ থেকে নেওয়া ১০০ টাকা ফি কোন খাতে খরচ হবে, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি জানান তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিগত কয়েক দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপরিকল্পিতভাবে লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া অসংখ্য হোটেল-রিসোর্ট গড়ে ওঠায় সেন্ট মার্টিনের ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শৈবাল ও পরিযায়ী পাখির অনেক প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সম্প্রতি ‘জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম’-এ প্রকাশিত ২০২৬ সালের মে মাসের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন বন্ধ থাকায় সমুদ্রে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াসহ সামুদ্রিক পরিবেশের লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছিল।
পর্যটক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ও পরিবেশগত শঙ্কার বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যস্ততার কারণে তা সম্ভব হয়নি। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেনের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো উত্তর মেলেনি। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম বিদেশে অবস্থান করায় তাঁর সঙ্গেও সরাসরি বা লিখিত প্রশ্নে কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।