রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর ওয়াসা গেটসংলগ্ন সিটি পল্লি এলাকায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মাদকবিরোধী অভিযানের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারুফ ওরফে দুখু মিয়া নামের এক কারখানাশ্রমিক নিহত হয়েছেন। এলাকাটি স্থানীয়দের কাছে আউটফল ও তেলেগু কলোনি নামেও পরিচিত। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সঘটিত এই ঘটনায় এক তরুণের মৃত্যু ও গোলাগুলির তথ্য পাওয়া গেলেও প্রাণঘাতী গুলিটি ঠিক কার অস্ত্র থেকে বেরিয়েছিল, তা নিয়ে বড় ধরনের রহস্য ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মারুফ একটি সিলভার বা অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার দিকে কাজ শেষে বাসায় ফেরেন তিনি। পোশাক পরিবর্তন করে বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ঘরে ফিরে স্ত্রী মীম আক্তার রুনাকে দ্রুত খাবার প্রস্তুত করতে বলেন। ‘তাড়াতাড়ি রান্না করো, অনেক ক্ষুধা লেগেছে। আমি আসছি’— স্ত্রীকে এ কথা বলেই ঘর থেকে বের হন মারুফ। বাইরে গোলাগুলির শব্দ শুনে দূর থেকে ঝামেলা দেখতে গিয়েই তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারুফকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে রাত ৭টা ৫০ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রায় এক বছর চার মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া মারুফের কোনো সন্তান নেই। তাঁর বাবা প্রয়াত আবদুর রশিদ। মা সেলিনা বেগম বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট মারুফ ও মায়ের আয় দিয়েই সংসার চলত। মারুফের মা সেলিনা বেগম বলেন, তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না এবং এলাকায় তিনি ভালো ছেলে হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। মারুফের স্ত্রী মীমের প্রশ্ন, ‘আমার স্বামী হত্যার বিচার কি পাব না?’
মারুফের শরীরে গুলির আঘাত ও গতিপথ নিয়ে অসংগতি তৈরি হয়েছে। নিহতের মা জানিয়েছেন, তাঁর ছেলের গলায় গুলি লেগেছিল। তবে মামলার এজাহারে ডান কাঁধে গুলি লাগার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, গলার দিক থেকে শরীরের নিচের অংশ পর্যন্ত গুলির গতিপথ রয়েছে। ফলে গুলি কোন দিক থেকে এসেছিল তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অভিযানের বিষয়ে এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক মো. আসাদুজ্জামান জানান, ওই এলাকার চারতলা পরিত্যক্ত ভবন ও সরু গলিতে মাদক কারবারিদের একটি চক্র সক্রিয় থাকায় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলে করে চার সদস্যের একটি দল সাদা পোশাকে সেখানে গেলে সেখানে মাদকদ্রব্য দেখতে পেয়ে চারজনকে আটকের চেষ্টা করে। তাঁদের কাছ থেকে ২৪৫টি ইয়াবা বড়ি ও ১৩৯ পুরিয়া হেরোইন পাওয়া যায়। আটক চারজনের মধ্যে তিনজনকে হাতকড়া পরানোর পর তাঁরা চিৎকার শুরু করলে প্রচুর মানুষ জড়ো হয়ে এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।
এসআরবি কর্মকর্তার দাবি, হামলাকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মারধর করে মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় এবং পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় হামলাকারীদের পক্ষ থেকে ৬ থেকে ৮টি গুলি চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও প্রাণ রক্ষার্থে এসআরবি সদস্যরা আকাশের দিকে চারটি ফাঁকা গুলি ছুড়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। এসআরবি প্রতিনিধিরা জানান, তাঁদের ফাঁকা গুলি নাকি হামলাকারীদের গুলিতে মারুফের মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ঘটনার পর পুলিশের মামলার বিবরণ নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে এসেছে। এজাহারে বাদী হিসেবে মারুফের মা সেলিনা বেগমের নাম ও সাথে বড় ছেলে মো. আলী হোসেন হাওলাদারের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়, সন্ধ্যা সাতটার দিকে ১৪ নম্বর আউটফল স্টাফ কোয়ার্টারের পরিত্যক্ত ভবনের সামনে গোলাগুলি দেখে পালানোর সময় মাদক কারবারিদের গুলিতে মারুফ আহত হন এবং এসআরবি কেবল ফাঁকা গুলি ছুড়েছিল। তবে সেলিনা বেগম অভিযোগ করেন, বুধবার দুপুর ১২টায় থানায় যাওয়ার পর বিকেল চারটা পর্যন্ত বসিয়ে রেখে একটি কাগজে তাঁর টিপসই নেওয়া হয়, যার বিষয়বস্তু তিনি জানতেন না।
ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামি জানিয়েছেন, এ ঘটনায় হত্যা, মাদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে ধলপুর সিটি পল্লিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪০ জনকে আটক করা হয়েছে, যা স্থানীয় শ্রমজীবী বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। মারুফের বোন রোকসানা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক ভাই প্রাণ হারানোর পর এলাকায় নতুন করে হয়রানি করা হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মাদক কারবারের অভিযোগ থাকায় ওই বস্তিটি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত আরও কঠোর করা হয়েছে।
এদিকে حقوقی সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অভিযানের ঘটনাটি নিয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে সেখানে সরাসরি গুলি ছোড়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। নিরপেক্ষতা ও সত্যতা নিশ্চিত করতে সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সেখানে ১২০টি ঘর নির্মাণের একটি প্রকল্পের কথা জানানো হয়েছিল।উপকমিশনার বলেন, ‘এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনার পর বস্তিটি উচ্ছেদ করার বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।